অনুজ সাংবাদিক অশোকের (সেনগুপ্ত) কাছে আজ দুপুরে প্রথম শুনলাম শংকরদা সাহিত্যিক মনিশংকর মুখোপাধ্যায় আর নেই। বহুকাল দেখা নেই। কিন্তু একটা স্বজন-বিয়োগের ধাক্কা এসে পড়ল মনে। অশোক আমাকে নিউজস্কোপ’-এর জন্য একটা স্মৃতিচারণ করতে বলল। কিন্তু নীল আকাশে মেঘের ভেলার মত তো স্মৃতিগুলো ভেসে গিয়েছে। ধরে আনার সেই ক্ষমতা আমার আছে কী?
শংকর কেবল জনপ্রিয় লেখক নন, নিজস্ব লেখনভঙ্গি তিনি বারবার ভেঙেছেন। বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শন নিয়ে লেখা তাঁর গ্রন্থগুলি দীর্ঘদিন বেস্টসেলার তালিকায় থেকেছে। ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও মানবজীবনের গভীর প্রশ্ন—সবেতেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তাঁর লেখা নিয়ে উক্তি-সহযোগে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ হতে পারে। সেগুলো তোলা থাক তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠক ও সতীর্থদের স্মৃতিচারণের জন্য।
স্টেটসম্যানে সাংবাদিক থাকাকালীন বাংলাতেও লেখালেখি করতাম। তবে বাংলায় আরও একটু বেশি লেখার একটা ইচ্ছে ছিল। এই সঙ্গে ওই পত্রিকায় সম্পাদকের পদ থেকে অমলেন্দু দাশগুপ্তর অবসর নেওয়ার সময় হয়ে এসেছে। তাই একটু চিন্তায় ছিলাম।
চার দশক আগের কথা। ১৯৮৬ সালে আমার ছেলে খুব ছোট। ও অসুস্থ ছিল। চিকিৎসার জন্য অনেক খরচ হ’ত। শংকরদা সেটা জানতেন। উনি দি স্টেটসম্যানে আমাদের ঘরে আসতেন। একদিন সরাসরি বললেন, ডানলপে চলে এসো। তোমার মতো ছেলে দরকার। সব ভেবে ছেড়ে দিলাম স্টেটসম্যান।
আমার নতুন কর্মস্থল হল ডানলপ ভবন। এই পরিবর্তন আমাকে ঋদ্ধ করেছে। শংকরদার ভাবনা অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর বিশেষ ১২টি ছবি নিয়ে আকর্ষণীয় ক্যালেন্ডার করলাম। ছবি বাছতে আমরা বিশ্বভারতীতে গিয়েছিলাম। সেই ক্যালেন্ডার হইহই ফেলে দিল। পরের বছর তাঁর নেতৃত্বে বার করলাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর এরকম ১২ পৃষ্ঠার ক্যালেন্ডার। সেটাও মারাত্মক হিট। তারও পরের বছর ডানলপ বার করেছিল গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর।
একটু মনে করলে শংকরদাকে নিয়ে ছোটখাট নানা সুখস্মৃতি ভেসে উঠছে মানসপটে। অনেক বেশি বেতন। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, সাংবাদিকতায় অনেক বেশি তৃপ্তি পেতাম। জনসংযোগে তা পাচ্ছিলাম না। ঘনিষ্ঠমহলে তা বলেছিলাম। ১৯৮৮-র শেষদিকে আবার ফিরে এলাম সংবাদপত্রে। এবার ইকনমিক টাইমসে। তখন ওখানকার রেসিডেন্ট এডিটর জয়ন্ত সরকার। শংকরদা খুব দুঃখ পেয়েছিলেন ডানলপ ছেড়ে দেওয়ায়।
গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অশোক হঠাৎ আবদার ধরল আমার ওপর বই বার করবে। সম্মতি দিলাম। প্রথমেই ঠিক করলাম বইটার ভূমিকা লেখাব শংকরদাকে দিয়ে। অশোকই নম্বর যোগার করে দিল। ফোনে পাচ্ছি না। ওকে নিয়ে ২৮ ডিসেম্বর, রবিবার সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ সোজা চলে গেলাম বণ্ডেল রোডে শংকরদার ফ্ল্যাটে। ঢুকতেই কেয়ারটেকারের কাছে শুনলাম শংকরদাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
দোতলায় ওনার ফ্ল্যাটে বেল বাজাতে বোন দরজা খুললেন। জানালেন, একদিন আগেই দাদাকে পড়ে গিয়ে কোমড়ে চোট পেয়েছেন। বোধহয় হাড় ভেঙে গিয়েছে। উনি আমাদের ভেতরে এসে চা পানের বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও তা রাখতে পারিনি। বললাম, হাসপাতালে আর যাব না। একটু সুস্থ হোন। আবার আসব। তখন শংকরদার সঙ্গে নিশ্চয়ই
দেখা হবে।”
বাসনার সেই শেষ দেখা হল না। অশোক হোয়াটসঅ্যাপে এর জন্য আমাদের অবিবেচনাকেই দায়ী করল। জবাবে সেটা স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। অমৃতলোকে ভালো থাকুন শংকরদা।
(অশোক সেনগুপ্তর অনুলেখন).

