একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতির সংজ্ঞা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগেকার দিনে কোনো দেশের শক্তির পরিচয় মিলত তার ইস্পাত কারখানা বা ভারী পণ্য রফতানির ক্ষমতায়। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে ছবিটা অন্যরকম। এখন কনটেন্ট (Content), কপিরাইট (Copyright) এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবই হয়ে উঠেছে উন্নয়নের নতুন মাপকাঠি। এই বিশেষ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রটিকেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’ (Orange Economy)। আর এই দৌড়ে বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে সামনের সারিতে উঠে আসছে ভারত (India)।
আকাশছোঁয়া প্রবৃদ্ধির পথে বিনোদন ও মিডিয়া জগৎ
সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে ভারতের মিডিয়া (Media) এবং বিনোদন খাতের বাজারমূল্য প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। আশা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে এই ক্ষেত্রটি ৩,০৬৭ বিলিয়ন টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে ভারতের প্রায় ১ কোটির বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সৃজনশীল শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। সিনেমা থেকে শুরু করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে বার্ষিক আউটপুট (Output) প্রায় ৩ লক্ষ কোটি টাকা।
ডিজিটাল বিপ্লব ও এভিজিসি-এক্সআর (AVGC-XR) এর দাপট
ভারতের সৃজনশীল অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে অ্যানিমেশন (Animation), ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (Visual Effects – VFX), গেমিং (Gaming) এবং এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি (Extended Reality)। সংক্ষেপে যাকে বলা হচ্ছে এভিজিসি-এক্সআর (AVGC-XR)। হলিউড (Hollywood) থেকে শুরু করে বিশ্বের বড় বড় ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের প্রজেক্টে এখন ভারতীয় শিল্পীদের ছোঁয়া থাকছে।রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের উচ্চ-বৃদ্ধির খাতগুলোর চিত্রটি নিম্নরূপ: ১.অ্যানিমেশন ও ভিএফএক্স: প্রায় ১০৩ বিলিয়ন টাকা।
২.গেমিং শিল্প: প্রায় ২৩২ বিলিয়ন টাকা।
৩.লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট: ১০০ বিলিয়নের বেশি।
গেমিং: নিছক বিনোদন নয়, আয়ের নতুন পথ
স্মার্টফোন এবং সস্তা ইন্টারনেটের দৌলতে কলকাতা (Kolkata) থেকে দিল্লি (Delhi), মুম্বই (Mumbai) থেকে চেন্নাই (Chennai)—ভারতের প্রতিটি কোণায় এখন অনলাইন গেমিংয়ের জোয়ার। এটি এখন আর কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, বরং পেশাদার ই-স্পোর্টস (E-sports) এবং আয়ের একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় গেম ডেভেলপাররা এখন আন্তর্জাতিক মানের গেম তৈরি করছেন, যা বিশ্ববাজারে ভারতের মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (Intellectual Property) শক্তিশালী করছে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই সৃজনশীল শিল্পে প্রায় ২০ লক্ষ দক্ষ পেশাদারের প্রয়োজন হবে। এই চাহিদা মেটাতে ভারত সরকার স্কুল ও কলেজ স্তরে বিশেষ ল্যাব তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রায় ১৫,০০০ মাধ্যমিক স্কুল এবং ৫০০টি কলেজে এভিজিসি (AVGC) কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই ছাত্রছাত্রীদের পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সৃজনশীল প্রযুক্তি বা ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি (Creative Technology)-তে দক্ষ করে তোলা।
বিশ্বমঞ্চে ভারত: ‘ক্রিয়েট ইন ইন্ডিয়া’
ভারতের লক্ষ্য এখন স্থানীয় প্রতিভাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়া। এই উদ্দেশ্যেই আয়োজিত হচ্ছে ডব্লিউএভিইএস (WAVES) বা ‘ওয়ার্ল্ড অডিও ভিজ্যুয়াল অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট সামিট’-এর মতো আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান। ‘ক্রিয়েট ইন ইন্ডিয়া চ্যালেঞ্জ’ (Create in India Challenge)-এর মাধ্যমে নতুন নতুন স্টার্টআপ (Startup) এবং সৃজনশীল প্রতিভাকে সরাসরি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।পরিশেষে বলা যায়, আগামী দশকে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারিগর হতে চলেছে এই সৃজনশীল শিল্প। কল্পনা যেখানে আয়ের উৎসে পরিণত হয়, সেখানেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত সমৃদ্ধি। আর ভারত সেই রূপান্তরের পথেই সফলভাবে অগ্রসর হচ্ছে।

