দেশের অটুট নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও একবার বড়সড় ফাটলের ইঙ্গিত পাওয়া গেল। দেশের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা খোদ ভারতীয় বায়ুসেনা বা ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের (Indian Air Force) অন্দরমহল থেকে এক কর্মীকে চরবৃত্তির মারাত্মক অভিযোগে গ্রেফতার করা হলো। জানা গিয়েছে, কিছু টাকার লোভে ওই কর্মী দীর্ঘদিন ধরে শত্রুদেশ পাকিস্তানের (Pakistan) গুপ্তচর সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অতি সংবেদনশীল এবং গোপন সব তথ্য। অসমের (Assam) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি থেকে তাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করার পর এই চাঞ্চল্যকর খবরটি জনসমক্ষে এসেছে। দেশের সামরিক বাহিনীর ভেতরেই এমন বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা সামনে আসায় গোটা ভারতজুড়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, চরবৃত্তির অভিযোগে ধৃত ওই বায়ুসেনা কর্মীর নাম সুমিত কুমার (Sumit Kumar)। ৩৬ বছর বয়সী ওই যুবকের আদত বাড়ি উত্তরপ্রদেশের (Uttar Pradesh) প্রয়াগরাজ (Prayagraj) শহরে। তিনি বিগত বেশ কিছুদিন ধরে অসম রাজ্যের ডিব্রুগড় (Dibrugarh) জেলায় অবস্থিত চাবুয়া (Chabua) এয়ার ফোর্স স্টেশনে মাল্টি-টাস্কিং স্টাফ বা এমটিএস পদে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে কর্মরত ছিলেন। রাজস্থান ইন্টেলিজেন্স এবং বায়ুসেনার নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগের এক দীর্ঘায়িত, যৌথ ও অত্যন্ত গোপন সামরিক অভিযানের মাধ্যমেই তাকে চাবুয়া থেকে আটক করা সম্ভব হয়। গ্রেফতারের পরপরই অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে রাজস্থানের (Rajasthan) রাজধানী জয়পুর (Jaipur) শহরে কড়া নিরাপত্তায় নিয়ে আসা হয়েছে।
তদন্তকারী আধিকারিকরা জানিয়েছেন, এই গ্রেফতারির সূত্রপাত কিন্তু হঠাত করে একদিনে হয়নি। গত কয়েক মাস ধরেই এই চক্রের উপর নজর রাখা হচ্ছিল। পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের দিকে জয়সলমের (Jaisalmer) বাসিন্দা ঝাবরা রাম (Jhabara Ram) নামক এক ব্যক্তিকে সন্দেহজনক কার্যকলাপের জন্য আটক করা হয়েছিল। গোয়েন্দাদের টানা জেরার মুখে অবশেষে ভেঙে পড়ে ওই ব্যক্তি এবং এরপরই এই বিশাল গুপ্তচর চক্রের আসল পর্দাফাঁস হতে শুরু করে। জানা যায়, ঝাবরা রামের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের নিয়মিত ও সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তার দেওয়া গোপন তথ্যের সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা সুমিতের খোঁজ পান এবং তার সমস্ত কার্যকলাপের উপর কড়া নজরদারি শুরু করেন।
জেরায় গোয়েন্দারা আরও এক ভয়ানক তথ্য জানতে পেরেছেন। সুমিত ২০২৩ সাল থেকেই পাক গুপ্তচরদের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ রেখে চলছিলেন। নিজের এমটিএস পদের সুযোগ নিয়ে তিনি বায়ুসেনার একাধিক অতি গোপনীয় নথিপত্রে নজরদারি চালাতেন। এরপর সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অত্যন্ত সন্তর্পণে সেইসব স্পর্শকাতর তথ্য সীমান্তের ওপারে থাকা হ্যান্ডলারদের কাছে পাচার করে দিতেন। এর বিনিময়ে তিনি নিয়মিত পেতেন মোটা অঙ্কের টাকা।
সবচেয়ে উদ্বেগের এবং ভয়ের বিষয় হলো, সুমিত কেবল অসমের চাবুয়া নয়, বরং রাজস্থানের বিকানেরের (Bikaner) নাল (Nal) এয়ার ফোর্স স্টেশন সম্পর্কেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শত্রুদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে ভারতের অগ্রিম সারির যুদ্ধবিমানগুলোর সঠিক অবস্থান, মিসাইল সিস্টেম বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার খুঁটিনাটি নকশা, এবং বায়ুসেনার উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য। শুধু তথ্য পাচারই নয়, নিজের নামে তোলা ভারতের বৈধ মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে তিনি পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের জন্য ভুয়ো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে দিতেও সাহায্য করেছিলেন, যা ব্যবহার করে তারা ভারতের অন্যান্য অংশে জাল বিস্তার করছিল। ইতিমধ্যেই ধৃত ওই কর্মীর বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট এবং ২০২৩ সালের বিএনএস অ্যাক্টের অধীনে জয়পুরের স্পেশাল পুলিশ স্টেশনে গত ২২ মার্চ তার বিরুদ্ধে একটি জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারীরা দৃঢ়ভাবে মনে করছেন, এই ঘটনার শিকড় অনেক গভীরে বিস্তৃত। এই পাকিস্তান-মদতপুষ্ট বিশাল গুপ্তচর চক্রের সঙ্গে আরও কারা কারা যুক্ত রয়েছে, দেশের অন্য কোনো সামরিক ঘাঁটি থেকে আরও তথ্য ফাঁস হয়েছে কি না, তা জানতে দেশজুড়ে জোরদার তদন্ত শুরু হয়েছে।


Recent Comments