
মাঝে ব্যবধান ৪২ বছরের। ১৯৮৪ আর ২০২৬– যেন তাসের এপিঠ আর ওপিঠ। ইতিহাস মিলিয়ে দিল রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের দুই নিম্ন রূপ।
১৯৮৪ সাল। এই প্রতিবেদক সবে সাংবাদিক হিসাবে ঢুকেছেন তখনকার ঐতিহ্যের যুগান্তর পত্রিকাগোষ্ঠীতে। রাস্তাঘাট, ঘরোয়া আলোচনা, যায় খবরের কাগজের অফিসগুলোতে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল, রাজ্যের শাসকদলের তরফে
শ্রমিক অধিকারের নামে
আনন্দবাজার পত্রিকাগোষ্ঠীর দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা। কিভাবে শাসকপক্ষের চোখে চোখ রেখে, চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফের চালু হয়েছিল সেই পত্রিকা, সেই ইতিহাস আজ বিস্মৃতির ধারাপাতে হারিয়ে যাওয়ার পথে।
আমার তা হারায়নি। কারণ, ৫২ দিন বাদে ফের ৬, প্রফূল্ল সরকার স্ট্রিটের দরজা খুলেছিল। কিছুকালের মধ্যে আমিও বাসা বদল করে চলে আসি যুগান্তর থেকে আনন্দবাজারে। নিরন্তর শুনেছিলাম সেই ৫২ দিন এবং তার আগে-পড়ের দিনগুলোর আলেখ্য। আর তাই ১ সেপ্টেম্বর চকিতে মন চলে গেল ৪২ বছর আগের দিনগুলোয়।

১৯৮৪ সালে সিপিআই (এম) বা বামফ্রন্ট সমর্থিত ট্রেড ইউনিয়ন আনন্দবাজার গোষ্ঠীর প্রকাশনা সম্পূর্ণ বন্ধ করার এবং তাদের নিজস্ব কিছু দাবিদাওয়া পূরণের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলন চলাকালীন প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসের সামনে এবং ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। সংবাদপত্রটির সম্পত্তি নষ্ট করার পাশাপাশি কর্মরত অ-ধর্মঘটী ও মহিলা কর্মচারীদের মারধর ও হুমকি দেওয়া হয়।
অফিসের ২৫০ মিটারের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও পুলিশ হামলাকারীদের সরাতে বা কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি চালাতে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। সহিংস হামলা ও ক্রমাগত বাধার মুখে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রণ এবং প্রকাশনা কয়েক মাস সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনার পরে সংবাদের শিরোনাম নিয়ে প্রবল আপত্তি প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বলেন, ক্ষমা না-চাইলে গেরুয়া বসন পরে প্রতিবাদ হবে। সেই ধারা মেনেই আনন্দবাজার পত্রিকা দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখান এক দল গেরুয়া বসনধারী। একটি সংগঠনের নামে কয়েক জন বিক্ষোভকারী এসে মঙ্গলবার দুপুরে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে আনন্দবাজারের মূল ভবনের সামনে জড়ো হয়। পুলিশের ঘেরাটোপের মধ্যেই ভবনের মূল ফটকের উপরে গেরুয়া উত্তরীয় ঝুলিয়ে তাঁরা বিক্ষোভ-অবস্থানে বসেন। দাবি করেন, ‘‘আনন্দবাজার পত্রিকা সরকারের সমালোচনা করতেই পারে। মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনাও করতে পারে। কিন্তু গেরুয়া রংকে অসম্মান করার অধিকার কারও নেই। পুলিশের কথা মেনে আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শুধরে না-নিলে পরে বড় প্রতিবাদ হবে।’’
কিছুক্ষণ অবস্থানের পরে মূল ফটকের পাশের দুই থামে গেরুয়া রঙের পোঁচ লাগিয়ে ‘আনন্দবাজার হায় হায়’ স্লোগান দিতে দিতে বিক্ষোভকারীরা চলে যান।

আমজনতা দ্বিধাবিভক্ত।
বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব দাবি করেছেন, দলের তরফে এমন কোনও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়নি। ৪৬ বছর ধরে সক্রিয় সনাতনী হিন্দু বলরাম (প্রবীর) বসু একসময় আর এস এস-এর প্রচারবিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই প্রতিবেদককে বলেন,
ভারতে সর্বকালেই স্বাধীন চিন্তাভাবনাকে যথেষ্ঠ সম্মান দেওয়া হয়। গীতা, উপনিষদ ও অন্য শাস্ত্রেও প্রশ্ন তোলার বিধি প্রচলিত। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার– সবটাই স্বীকৃত। কিন্তু প্রশ্ন সেই চিন্তা রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন, মূল্যবোধ তৈরির ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক। যদি সংবাদপত্র দেশপ্রেম তৈরি এবং সমাজ গঠন করে তাহলে স্বাগতম। কিন্তু সেই সংঘাত যদি সমাজের ধ্বংশের কারণ হয়, তাহলে তাদের সতর্ক হতে হবে।”
গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতির (এপিডিআর) রাজ্য সম্পাদক রঞ্জিত সুর সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “গেরুয়া বাহিনী আজ আনন্দবাজার অফিসে গুন্ডামি করে প্রমাণ করে দি’ল আনন্দবাজার পত্রিকার ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ হেডিং কত ঠিক ছিল।
ধিক্কার!” আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন কার্যনির্বাহী সম্পাদক সুমন চট্টোপাধ্যায় এদিনের ঘটনার প্রাক্কালে তাঁর বিশেষ পরিবেশনায় ওই পত্রিকাকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য হুঁশিয়ারিকে অবিমৃষ্যকারিতা বলে মন্তব্য করে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
রাত পৌনে আটকিয়ে দেখছি, সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কর ঝড় বেশ তীব্র। সাহিত্যিক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “আনন্দবাজার পত্রিকার গায়ে যারা হাত দেয় বাঙালী তাদের তুলে আছাড় মারবে।” তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ লিখেছেন, “আনন্দবাজার পত্রিকায় আজ যা হল, তীব্র নিন্দা করছি। সিপিএমের আমলে আনন্দবাজার, উত্তরবঙ্গ সংবাদের উপর আক্রমণ এসেছে। কিন্তু এই 2026-এও এই গাজোয়ারি কায়দা! দেওয়ালে রং চলছে, পুলিশ দেখছে দাঁড়িয়ে!! মিডিয়ার সম্পাদকীয় বিষয়ের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। প্রতিবাদ হতে পারে। কিন্তু এইভাবে, গায়ের জোরে। চারপাশে যা হামলা চলছে, সেই সরকারি মদতে অপসংস্কৃতির এই বাহুবলী দেখনদারি বাংলার ভাবমূর্তিতে কুৎসিতভাবে আঘাত করল।”

সিপিএম-পন্থী একটি পোর্টাল কিশোরকুমারের একটি আমোদের গান যুক্ত করে, এদিনের ঘটনার আগের ও পরের দুটি ছবি দিয়ে লিখেছে, “ব্রেনডেড জম্বি বিজেপি ভক্তদের কেউ সিরিয়াসলি নিচ্ছে না।”
(এখানে লাল বেস-এর ওপর বসানো লেখার ছবি নেওয়ার অনুরোধ)
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পুত্র, প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক সম্রাট মুখোপাধ্যায় এদিনের ঘটনার ভিডিয়ো যুক্ত করে লিখেছেন, “আজ দুপুরে আমাদের কর্মস্থল আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসের সামনে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ আক্রান্ত। এবং সবটা ঘটল কলকাতা পুলিশের উপস্থিতিতে। এই না হলে রাম-রাজ্য।”
কলম-লেখক, বিশ্লেষক, অর্থনীতি-বিষয়ক নামী সাময়িকীর প্রাক্তন সাংবাদিক প্রতিম বসু ‘রং-ছাগল ও বাম্বাদিকতা’ শিরোনামে ফেসবুকের বড় লেখা লিখেছেন। তাঁর শেষ পংক্তি হল, “বিজেপি দুরে থাকলে বাম্বাদিকতা বেঁচে থাকবে।” ভবনের সাদা স্তম্ভ গেরুয়া রঙে রাঙানো ও পরক্ষণেই কর্তৃপক্ষের তরফে তাতে আবার সাদা রঙ চাপানোর দুটি ছবি পাশাপাশি দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার চিফ রিপোর্টার সোমা মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “এই ছবির ক্যাপশন পাঠক ঠিক করবেন।”। সচিত্র মন্তব্য করেছেন ওই পত্রিকার সাংবাদিক আর্যভট্ট খান।
একাধিক বিশ্লেষণ করেছেন বলিষ্ঠ সাংবাদিক অরূপ কালী। এর একটিতে বড় হরফে লিখেছেন, “আনন্দবাজারে গেরুয়া রং। অথচ আনন্দবাজার ডিজিটালে একলাইন খবর নেই। এক ভাই কি খবর চেপে সমর্থন জানালেন?” একটি নামী চ্যানেলের সিনিয়র সাংবাদিক দীপক ঘোষ লিখেছেন, “শান্তি- ত্যাগ-সংযম-সৌজন্য-সহিষ্ণুতা এবং শ্বেতকায় অসহায়তা।”
মোটের ওপর, মঙ্গলবারের ঘটনা সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতিবিদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কার, কতটা থাকা উচিত, তার নিয়ে তৈরি করল নয়া বিতর্ক। রাত যত গভীর হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে বেড়ে চলেছে হরেক প্রতিক্রিয়া।


Recent Comments