দীর্ঘ টালবাহানা এবং আদালতের রক্ষাকবচ পাওয়ার পর অবশেষে পুলিশের মুখোমুখি হলেন রাজ্যের প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা অরূপ বিশ্বাস। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির ‘ইন্ডিয়া গোট ট্যুর’ (India GOAT Tour) অনুষ্ঠান ঘিরে তৈরি হওয়া ব্যাপক অনিয়ম, টিকিট কালোবাজারি এবং চরম বিশৃঙ্খলার তদন্তে বৃহস্পতিবার তাঁকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করল বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ।
টানা ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর্ব চলার পর, দুপুর ১টা ১৫ মিনিট নাগাদ কালো কাচ ঢাকা একটি গাড়িতে করে থানা চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে যান প্রাক্তন মন্ত্রী।
হাইকোর্টের রক্ষাকবচ ও তিন ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এর আগে পরপর তিনটি সমন এড়িয়ে যাওয়ার পর, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিট নাগাদ বিধাননগর দক্ষিণ থানায় হাজিরা দেন অরূপ বিশ্বাস। কলকাতা হাইকোর্টের দেওয়া শর্তসাপেক্ষ আইনি রক্ষাকবচ (গ্রেফতারির ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ) থাকার কারণেই এদিন তিনি তদন্তকারীদের মুখোমুখি হন।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে থানা থেকে বেরোনোর সময় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান:
“যেহেতু বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন (Sub-judice), তাই এই নিয়ে আমি বাইরে কিছু বলব না। পুলিশ তদন্তের স্বার্থে যতবার ডাকবে, আমি ততবারই আসব এবং পূর্ণ সহযোগিতা করব। বাকি সত্য যা তা আদালতেই প্রমাণিত হবে।”
তবে তদন্ত শেষ হয়নি। পুলিশ সূত্রে খবর, আগামী ২২ জুন প্রাসঙ্গিক সমস্ত নথিপত্র সহ অরূপ বিশ্বাসকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।
কী এই ‘মেসি কাণ্ড’? ঠিক কী অভিযোগ রয়েছে প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে?
২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে (যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি পলের উপস্থিতিতে একটি হাই-প্রোফাইল ফুটবল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ৪,৫০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা পর্যন্ত চড়া দামে টিকিট কিনেও হাজার হাজার সাধারণ দর্শক মাঠের ভেতর মেসির একঝলক দর্শন পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, তাঁর আত্মীয়স্বজন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাঠের ভেতর মেসিকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিলেন, যার ফলে মাত্র ২২ মিনিটেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন ফুটবল তারকা। এর জেরে ক্ষুব্ধ দর্শকরা স্টেডিয়ামে ব্যাপক ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালায়।
পরবর্তীতে এই অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক শতদ্রু দত্ত জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর, গত ১৭ মে অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের করেন। তাঁর মূল অভিযোগগুলি হলো:
- টিকিট কালোবাজারি ও তোলাবাজি: অরূপ বিশ্বাস মন্ত্রী পদের অপব্যবহার করে জোরপূর্বক হাজার হাজার কমপ্লিমেন্টারি টিকিট ও পাস আদায় করেন এবং সেগুলি অবৈধ উপায়ে বাজারে বিক্রি করে কালোবাজারি চালান।
- প্রতারণা ও হুমকি: আয়োজকদের ভয় দেখিয়ে এবং আর্থিক জালিয়াতি করে পুরো অনুষ্ঠানটিকে বানচাল করার চেষ্টা করা হয়।
মেসির টিমের চিঠিতে নয়া মোড়
এই তদন্ত চলাকালীনই বুধবার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন আয়োজক শতদ্রু দত্ত। তাঁর দাবি, খোদ লিওনেল মেসির নিজস্ব কমিউনিকেশন টিম বিধাননগর পুলিশকে একটি ইমেল বা চিঠি পাঠিয়েছে। ওই চিঠিতে মাঠের ভেতর নিরাপত্তা ও প্রোটোকল লঙ্ঘনের জন্য সরাসরি তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং তাঁর অনুগামীদের দায়ী করা হয়েছে এবং আয়োজকদের এই অব্যবস্থার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যদিও এই চিঠির সত্যতা নিয়ে বিধাননগর পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারা এখনও অফিশিয়ালি কোনও মন্তব্য করেননি।
রাজ্যে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই কার্যত অন্তরালে ছিলেন অরূপ বিশ্বাস। এবার মেসির সফর ঘিরে তৈরি হওয়া এই কোটি কোটি টাকার কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির তদন্তে পুলিশি জেরার মুখে পড়ে তাঁর অস্বস্তি আরও বাড়ল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।


Recent Comments