কলকাতা (Kolkata) শহরে আগামী ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবস (International Yoga Day) পালনকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। রাজ্যের মুখ্যসচিবের জারি করা এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, সরকারি, আধা-সরকারি এবং চুক্তিভিত্তিক সমস্ত কর্মীদের ওইদিন নির্দিষ্ট সময়ে যোগাভ্যাসে অংশগ্রহণ করতে হবে। নবান্নের এই ফরমানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) দ্বারস্থ হয়েছেন মামলাকারীরা।
সম্প্রতি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়, যেখানে ১৪ জুন প্রধান সচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল জানিয়েছিলেন যে ২১ জুন সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে ৭টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত সমস্ত কর্মীকে যোগ দিবসের কর্মসূচিতে যোগ দিতে হবে। শুধুমাত্র স্থায়ী কর্মীই নয়, চুক্তিভিত্তিক, পার্ট-টাইম এমনকি দৈনিক মজুরিতে কর্মরত কর্মীদেরও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই নির্দেশ আসার পরেই সরকারি কর্মীদের অন্দরে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে।
অনেকের দাবি, ছুটির দিনে এইভাবে বাধ্যতামূলকভাবে যোগাভ্যাসে অংশগ্রহণ করা ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিপন্থী।মামলাটি হাইকোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিনহার এজলাসে ওঠে। মামলাকারীদের আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য সওয়াল করেন যে, সরকারের এই নির্দেশিকাটি আদতে একটি ‘ম্যান্ডেটরি ডিরেক্টিভ’ বা বাধ্যতামূলক নির্দেশ। তিনি বলেন ‘যোগের জন্য রাজ্যের বিষ্টু ঘোষের নাম আমরা জানি। তাঁকে জাপানেও আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’ রাজ্যের তরফ থেকে দাবি করা হয় ‘কোনও সংগঠন কর্মসূচিতে যুক্ত না হতে চাইলে, তারা আলাদা করে মামলা করুক। গত বছর অন্ধ্রপ্রদেশে ৩ কোটি মানুষের জমায়েত হয়েছিল। এ বার আমরা রেকর্ড করতে চাই।’ এর পরিবর্তে বিচারপতি জবাব দেন ‘এমন অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা কাম্য নয়।’
তাঁর মতে, অংশগ্রহণ করা বা না করা সম্পূর্ণভাবে একজন কর্মীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। এর জবাবে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য আদালতে জানান, সরকার কোনো কর্মীকে বাধ্য করছে না। তিনি দাবি করেন, এই নির্দেশিকা কেবল একটি ‘অনুরোধ’ ছিল, কোনো কঠোর নিয়ম নয়। তাঁর কথায়, নাগরিকদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে সরকার উৎসাহ দিচ্ছে মাত্র।এই বিতর্কের মাঝেই আদালতের পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
আদালত স্পষ্ট করেছে, নির্দেশিকায় বলা হয়েছে বলে তা বাধ্যতামূলক হয়ে যায় না। তবে সরকারি কর্মীদের কাজের নৈতিকতা নিয়েও পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে বেঞ্চ। রাজ্যের তরফে সাফাই দিয়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপুঞ্জ পরিচালিত এই কর্মসূচিতে কলকাতা শহরের রেড রোডে (Red Road) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়ার লক্ষ্যেই সরকার সর্বোচ্চ সংখ্যক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইছে।সরকারি কর্মীদের একাংশের মতে, তাঁদের ওপর চাপানো এই নির্দেশ অযৌক্তিক।
বারুইপুরের (Baruipur) এক সরকারি কর্মীর কথায়, ছুটির দিনে এত ভোরে অফিসে উপস্থিত হওয়া অনেকের জন্যই দুরূহ। এছাড়া অনেকের ব্যক্তিগত পারিবারিক পরিকল্পনাও এই নির্দেশিকার ফলে ভেস্তে গেছে। দিল্লির (Delhi) ক্ষেত্রে নিয়মটি যেখানে অনেকটাই নমনীয়, সেখানে রাজ্যে এই কড়াকড়ি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
উল্লেখ্য, রেড রোডে যোগ দিবসের মূল অনুষ্ঠানের জন্য গত কয়েকদিন ধরেই যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। সাত দিন রাস্তা বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও পৃথকভাবে হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। আইনজীবী সংগঠনের তরফে দাবি করা হয়েছে, মাত্র দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠানের জন্য রেড রোড এবং সংলগ্ন এলাকার জনজীবন এভাবে বিপর্যস্ত করা ঠিক নয়।


Recent Comments