উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল শুক্রবার। শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিলেন প্রবীণ তৃণমূল নেতা গৌতম দেব। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। কারণ, উত্তরবঙ্গে একের পর এক রাজনৈতিক ধাক্কার পর শিলিগুড়ি পুরনিগমই ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি। গৌতম দেবের পদত্যাগ সেই সমীকরণকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল।
শুক্রবার সকালে পুর কমিশনারের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন গৌতম দেব। সম্প্রতি তাঁকে দার্জিলিং জেলা তৃণমূল (সমতল)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে এবং উত্তরবঙ্গে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে এই সিদ্ধান্ত এত সহজে মেনে নিতে পারেননি পুরনিগমের অনেক মেয়র পারিষদ। বৃহস্পতিবার মেয়র পারিষদদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে গৌতম দেব নিজের ইস্তফার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন। তখনই মতভেদ সামনে আসে। একাংশ মনে করেন, পুরবোর্ডের মেয়াদ এখনও এক বছরেরও বেশি বাকি থাকায় এই মুহূর্তে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। অন্যদিকে গৌতম দেব নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে জল্পনার অবসান ঘটে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের মতো জেলাগুলিতে তৃণমূলের ফল আশানুরূপ হয়নি। দলের একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেই পরিস্থিতিতে শিলিগুড়ি পুরনিগম ছিল উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের প্রশাসনিক উপস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রতীক।
গৌতম দেবের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তিনি উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের দায়িত্ব পান। পরে পর্যটনমন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেন। যদিও ২০২১ সালে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্র এবং ২০২৬ সালে শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয় তাঁকে। কিন্তু ২০২২ সালের শিলিগুড়ি পুরনিগম নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বেই তৃণমূল উল্লেখযোগ্য জয় পেয়ে বোর্ড গঠন করেছিল।
এখন প্রশ্ন উঠছে, গৌতম দেবের ইস্তফার পর শিলিগুড়ি পুরনিগমে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে কি না, নাকি রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যাবে। অনেকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন মেয়র নির্বাচন করে স্থিতিশীল বোর্ড গঠন করা সহজ হবে না। ফলে উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক শক্তি আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি শুধু একজন মেয়রের পদত্যাগ নয়; বরং উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার সূচনা। আগামী দিনে শিলিগুড়ির রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজ্য রাজনীতির।


Recent Comments