টলিউড (Tollywood) অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় (Rahul Arunoday Banerjee)-এর আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা বাংলা। শুটিং চলাকালীন এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর থেকেই একাধিক প্রশ্নচিহ্ন উঠতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই জল্পনা রটেছে যে, দুর্ঘটনার সময় অভিনেতা মত্ত অবস্থায় ছিলেন কিনা। এই সমস্ত জল্পনা ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এবার তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও অত্যন্ত কাছের বন্ধু, বিশিষ্ট নাট্যকার সৌরভ পালোধি (Saurav Palodhi)।
মত্ত থাকার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অপমানজনক
রাহুলের মৃত্যুর পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রটানো হয় যে, তিনি নাকি সেই রাতে নেশাগ্রস্ত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে সৌরভ স্পষ্ট জানান যে, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যে রটনা। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, “রাহুলদা নিজে জেদ করে আমাকে প্রতিদিন এসে বলতেন, সৌরভ তিন মাস হয়ে গেল কিন্তু ছুঁইনি, চার মাস হয়ে গেল কিন্তু ছুঁইনি।” সৌরভ নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, রাহুল অনেকদিন ধরেই মদ্যপান ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। এই ধরনের অপপ্রচার করে মৃত অভিনেতার মর্যাদাহানি করার বিরুদ্ধে তিনি সরব হয়েছেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্টেও মত্ত থাকার কোনও প্রমাণ মেলেনি বলে তিনি দাবি করেন। সৌরভের মতে, রাহুল নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এই খারাপ অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, যা নিয়ে তিনি গর্ব করতেন।
নিরাপত্তার অভাব ও প্রযোজক সংস্থার চূড়ান্ত গাফিলতি
সৌরভের মূল অভিযোগের তির শুটিং সেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা সংস্থার দিকে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একটি শুটিং ফ্লোরে কেন ন্যূনতম সেফটি মেজারস (Safety Measures) বা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে না? তাঁর মতে, যদি সঠিক সুরক্ষাবিধি মেনে কাজ হতো, তাহলে হয়তো এত বড় দুর্ঘটনা অনায়াসেই এড়ানো যেত এবং আজ রাহুল আমাদের মাঝেই থাকতেন। সৌরভ আরও অভিযোগ করেন যে, দুর্ঘটনার পর প্রযোজনা সংস্থার তরফ থেকে একাধিক বয়ান দেওয়া হয়েছে। সত্যি ঘটনা হলে কেন বারবার বয়ান বদল করা হবে? আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে কেন তাদের বিবৃতি তৈরি করতে হলো, তা নিয়েও তিনি গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
ষড়যন্ত্র ও আসল ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা
সৌরভের কথায় স্পষ্টতই একটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি মনে করেন, প্রযোজনা সংস্থার মারাত্মক গাফিলতিকে আড়াল করার জন্যই অভিনেতার মত্ত থাকার এই মিথ্যে গল্পটি রটানো হচ্ছে। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা কর্পোরেট সংস্থা স্রেফ নিজেদের ভিউজ ও টিআরপি বাড়ানোর জন্য এই ধরনের অসংবেদনশীল কাজ করছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, এই ঘটনার পেছনে এমন অনেক প্রভাবশালীর হাত থাকতে পারে, যারা আসল সত্যকে মানুষের চোখের আড়ালে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ন্যায়বিচারের জোরালো দাবি
সৌরভ তাঁর অকালপ্রয়াত বন্ধু ও সহকর্মীর মৃত্যুর জন্য সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি চান, যারা এই দুর্ঘটনার জন্য পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হোক। তিনি এও বলেন যে, রাজনৈতিক বা অন্য কোনও ক্ষমতা খাটিয়ে যেন সত্যকে ম্যানিপুলেট বা বিকৃত করা না হয়। রাহুলের মতো একজন প্রতিভাবান শিল্পী, যিনি নিজের কাজের পাশাপাশি একজন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি ছিলেন এবং বুকে লাল পতাকা নিয়ে চলে গেছেন, তাঁর প্রতি এই চূড়ান্ত অবিচার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
রাহুলের সৃষ্টিশীল কাজগুলো বেঁচে থাকুক আজীবন
দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের শেষে সৌরভ বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। যে রিহার্সাল রুমে তাঁরা ‘যে জানলাগুলোর আকাশ ছিল’ নাটকের মহড়া দিতেন, সেখানে বসেই তিনি বলেন, রাহুলের এই মর্মান্তিক দিকটি নিয়ে অনর্থক কাঁটাছেঁড়া না করে, তাঁর সৃষ্টিশীল কাজগুলো নিয়ে বেশি করে আলোচনা হওয়া উচিত। রাহুলের লেখা একাধিক নাটক, শর্ট ফিল্ম ও চিত্রনাট্য রয়েছে। সেই অসামান্য কাজগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্য দিয়েই তাঁকে প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব।
এই মৃত্যু কি নিছকই একটি দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনও গভীর রহস্য? বাংলার সাধারণ মানুষ এখন শুধু এই তদন্তের শেষ দেখার এবং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছেন।


Recent Comments