নদীয়া :- তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন হেভিওয়েট নেতা ও বিধাননগরের প্রাক্তন মেয়র সব্যসাচী দত্তকে ঘিরে চলা আর্থিক দুর্নীতির তদন্তে নতুন মোড় এল। বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের বিশেষ তদন্তকারী দল সোমবার গভীর রাতে নদিয়ার তেহট্টে জেলা পরিষদের সদস্যা টিনা ভৌমিক সাহার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ৩ কিলোগ্রাম সোনার অলঙ্কার উদ্ধার করেছে। বর্তমান বাজারদরে যার মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকা বলে অনুমান করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সব্যসাচী দত্তকে সঙ্গে নিয়েই এই তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। এর আগে রাজারহাটে তাঁর ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন ব্যাঙ্ক লকারে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় সাড়ে তিন কেজি সোনা এবং বিপুল পরিমাণ সোনা কেনার নথি উদ্ধার হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, সেই সূত্র ধরেই টিনা ভৌমিক সাহার বাড়িতে এই অভিযান চালানো হয়।
উদ্ধার হওয়া সোনার উৎস, অর্থের জোগান এবং সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখা শুরু করেছে পুলিশ।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর একের পর এক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে সব্যসাচী দত্তকে ঘিরে তদন্ত ক্রমশ বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসরে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, তোলাবাজি, জবরদখল এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর সব্যসাচী দত্তকে জেরা করেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে আসে।
পুলিশের দাবি, তদন্তে উঠে এসেছে যে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ সোনায় বিনিয়োগ করা হয়েছিল। শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমেও সেই বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের মতে, নদিয়ার জেলা পরিষদ সদস্যা টিনা ভৌমিক সাহা এই ঘনিষ্ঠ বৃত্তের অন্যতম সদস্য ছিলেন।
সূত্রের খবর, সব্যসাচীর রাজারহাটের ফ্ল্যাটে নিয়মিত যাতায়াত এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। উদ্ধার হওয়া সোনা কেনার রসিদ, ভাউচার এবং অন্যান্য নথি খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা সম্ভাব্য অর্থপাচার ও সম্পদ গোপনের দিকটিও খতিয়ে দেখছেন।
সোমবার রাতের অভিযান ছিল সেই তদন্তেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। গভীর রাতে বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে তেহট্টে পৌঁছে শুরু হয় দীর্ঘ তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ। কয়েক ঘণ্টার তল্লাশির পর প্রায় ৩ কিলোগ্রাম সোনার অলঙ্কার উদ্ধার হয়। তদন্তকারীদের মতে, উদ্ধার হওয়া সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের সময়কাল এবং অর্থের উৎস নির্ধারণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা দাবি করছে, এটি রাজ্যের পূর্বতন শাসক দলের শীর্ষস্তর পর্যন্ত বিস্তৃত দুর্নীতির প্রমাণ। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্টদের তরফে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তেহট্ট থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধারের ঘটনায় সব্যসাচী দত্তকে ঘিরে দুর্নীতির তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এটি কেবলমাত্র বিচ্ছিন্ন কোনও সম্পত্তি উদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি সম্ভাব্য আর্থিক নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে।
উদ্ধার হওয়া সোনার প্রকৃত উৎস, অর্থের লেনদেনের পথ এবং এর সঙ্গে আর কারা যুক্ত রয়েছেন, তা জানতে তদন্ত আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী দিনে এই মামলায় নতুন গ্রেফতারি, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা আরও সম্পত্তি উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসতে পারে বলেও প্রশাসনিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
ফলে সব্যসাচী দত্ত এবং টিনা ভৌমিক সাহাকে ঘিরে এই তদন্ত এখন শুধুমাত্র একটি ফৌজদারি মামলার সীমায় আবদ্ধ নেই; বরং তা রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অন্দরে দুর্নীতির অভিযোগের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।


Recent Comments