back to top
Tuesday, May 5, 2026
Leaderboard Ad Space (728x90) - Responsive
HomeবিনোদনSatyajit Ray: মাটি মনে রাখে: সত্যজিৎ রায়ের চোখে গ্রামবাংলার রূপ ও বেদনা

Satyajit Ray: মাটি মনে রাখে: সত্যজিৎ রায়ের চোখে গ্রামবাংলার রূপ ও বেদনা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লিখেছিলেন — মানুষ সারা পৃথিবী ঘুরে মহানদী আর পর্বতমালা দেখতে যায়, অথচ নিজের দরজার বাইরে ঘাসের ডগায় যে শিশিরবিন্দু জমে থাকে, তার অসীম সৌন্দর্যের কথা সে কোনোদিন টের পায় না। এই একটি কথার মধ্যে যদি কোনো চলচ্চিত্রকারের সারাজীবনের দর্শন লুকিয়ে থাকতে পারে, তাহলে সেই মানুষটির নাম সত্যজিৎ রায়

আমি যখন প্রথম পথের পাঁচালী দেখেছিলাম, তখন বুঝিনি কেন চোখ ভিজে যাচ্ছে। দুর্গা বৃষ্টিতে ভিজছে, হাসছে, চুল ছড়িয়ে দিচ্ছে আকাশের দিকে — এই দৃশ্যটা কোনো অভিনয় ছিল না। মনে হয়েছিল, এটা আমার পাশের গ্রামের কোনো মেয়ের গল্প। এটা আমার মায়ের ছোটবেলার গল্প। এটা বাংলার মাটির নিজের গল্প।
সত্যজিৎ রায় শুধু ছবি বানাননি। তিনি বাংলার আত্মাকে সেলুলয়েডে ধরে রেখেছিলেন।

যে চোখ দিয়ে তিনি দেখেছিলেন

১৯৫৫ সাল। ভারত স্বাধীন হয়েছে মাত্র আট বছর। দেশজুড়ে তখন সিনেমা মানে বম্বের চকচকে স্টুডিও, কৃত্রিম আলো, নকল সেট, আর বাধ্যতামূলক গান-নাচ। বাংলায় উত্তম-সুচিত্রার রোম্যান্টিক জগৎ দর্শকদের মন ভরিয়ে রাখছে। এই পরিবেশে একজন মানুষ ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন কলকাতার বাইরে — বোড়াল গ্রামের কাদামাটিতে, বর্ষার জলে, রোদের তাপে।

সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবির যাত্রা শুরু হয়েছিল এভাবেই — প্রায় কোনো টাকা নেই, নিজের স্ত্রীর গহনা বন্ধক রেখে, একটা ভাড়া করা ৩৫ মিলিমিটার ক্যামেরা নিয়ে। কিন্তু তাঁর কাছে যা ছিল, তা কোনো অর্থ দিয়ে কেনা যায় না — একটা অসাধারণ দৃষ্টি, যে দৃষ্টি মাটির কাছে নতজানু হতে জানে।

তাঁর ছবির আলো কৃত্রিম ছিল না। ছায়াচ্ছন্ন ঘরে সূর্যের আলো ঢোকাতে চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্র সাদা কাপড় আর আয়না ব্যবহার করতেন — প্রকৃতির আলোকেই ফিরিয়ে দিতেন প্রকৃতির কাছে। এই কৌশল পরবর্তীকালে সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্র জগৎ অনুসরণ করেছে। কিন্তু তাঁর জন্মটা হয়েছিল অভাবের মধ্যে, বাংলার একটা গ্রামের অন্ধকার ঘরে।

গভীর ফোকাস ক্যামেরায় রায় এমনভাবে ফ্রেম সাজাতেন যেখানে সামনে মানুষ আর পেছনে প্রকৃতি — দুটোই সমান স্পষ্ট। কারণ তাঁর কাছে প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়, সে একটি চরিত্র। সে কথা বলে, সে কাঁদে, সে নির্মম হাসে।

কাশবনের সেই দৌড়

পথের পাঁচালী-র যে দৃশ্যটার কথা একবার দেখলে ভোলা যায় না — অপু আর দুর্গার কাশবনে দৌড়। লম্বা সাদা কাশফুলের মাঠ, বাতাসে দুলছে, দুটো ছোট্ট শিশু সেই শুভ্রতার মধ্যে ছুটছে ট্রেন দেখতে।

রায় এই দৃশ্যে শিশুদের ছোট্ট করে রেখেছেন প্রকৃতির বিশালতার সামনে — ইচ্ছাকৃতভাবে। এই ফ্রেমে বলা আছে, মানুষ কতটা ক্ষুদ্র। তারপর হঠাৎ কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে ট্রেন আসে — সাদা কাশফুলের পাশ দিয়ে কালো লোহার দানব। এই দুই রঙের সংঘাতে লুকিয়ে আছে একটা পুরো সভ্যতার দ্বন্দ্ব — গ্রামীণ নিসর্গ আর আধুনিকতার আগ্রাসন।

আরো পড়ুন:  'আরে না রে বাবা…'! বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জল্পনায় জল ঢাললেন খোদ অরিজিৎ সিং

ট্রেনের নিচ থেকে তোলা শেষ শটটা আজও আমার বুকে ধাক্কা দেয়। চাকার শব্দে পৃথিবী কাঁপছে, আর সেই কম্পনে অপুর শৈশব ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

যে কান্না শোনা যায় না

পথের পাঁচালী-র শেষ দিকে হরিহর বাড়ি ফেরে। মাসের পর মাস বাইরে ছিল, জানে না মেয়ে দুর্গা মারা গেছে। সে হাসিমুখে ব্যাগ খোলে, বের করে একটা শাড়ি — দুর্গার জন্য আনা। সর্বজয়া তখন মেঝেতে বসে আছেন। নিঃশব্দে। তাঁর চোখ শূন্য। সারা শরীরে একটা পাথরের ভার। হরিহর বুঝতে পারে। শাড়িটা হাত থেকে পড়ে যায়।

এই মুহূর্তে সত্যজিৎ রায় একটা অসাধারণ সিদ্ধান্ত নেন। সর্বজয়ার কান্নার শব্দ তিনি রাখেননি। মুখ খুলে কাঁদছেন মা, কিন্তু শব্দ নেই। তার জায়গায় বেজে ওঠে তার শেহনাই — রবিশঙ্করের সেই করুণ সুর।
কারণ কিছু শোক এত গভীর যে সে ভাষা পায় না। কিছু কান্না এত বিশাল যে কোনো শব্দ তাকে ধরতে পারে না। শুধু সুর পারে। এই একটি মুহূর্তই বলে দেয় সত্যজিৎ রায় কেন মহান।

রবিশঙ্কর পরে বলেছিলেন, সেদিন প্রায় এগারো ঘণ্টা একটানা বাজিয়েছিলেন তিনি, ছবির দৃশ্য দেখে দেখে সুর বানাচ্ছিলেন। সেই সুর আর সেই ছবি একে অপরের ভেতরে এমনভাবে মিশে গেছে যে আলাদা করা যায় না।

বর্ষা যখন মৃত্যু নিয়ে আসে

ভারতীয় সাহিত্যে বৃষ্টি মানে জীবন। বৃষ্টি মানে ফসল। বৃষ্টি মানে প্রেম। সত্যজিৎ রায় এই চির চেনা প্রতীককে উলটে দিলেন।

দুর্গা বৃষ্টিতে নাচে। ভিজতে ভিজতে পুরনো বাংলা ছড়া বলে — “বৃষ্টি এসো, বৃষ্টি এসো।” সে আনন্দিত, সে মুক্ত। কিন্তু সেই বৃষ্টিতে ভিজেই তার জ্বর হয়। আর সেই জ্বর থেকেই মৃত্যু। যে বৃষ্টি জীবন দেয়, সেই বৃষ্টিই জীবন নিল।

প্রকৃতি এখানে নিষ্ঠুর নয়, প্রকৃতি এখানে উদাসীন। সে জানে না কে মরছে, কে বাঁচছে। সে শুধু তার নিজের নিয়মে চলে। এই উদাসীনতাই সবচেয়ে করুণ।

ছবির শেষে পরিবার চলে গেলে একটা সাপ নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে ভাঙা বাড়িতে। পাশ্চাত্যে সাপ পাপের প্রতীক। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের সাপ শুধু একটা প্রাণী — মানুষ চলে গেলে প্রকৃতি তার জায়গা ফিরে নেয়। এর বেশি কিছু নয়, এর কমও নয়।

আরো পড়ুন:  সত্যজিৎ রায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শব্দচর্চা ও এক দশক

সুন্দর মাঠে মৃত্যুর গন্ধ

অশনি সংকেত — ১৯৭৩ সালের ছবি। ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের কথা।

পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ মরেছিল সেই দুর্ভিক্ষে। কিন্তু সত্যজিৎ রায় একটা লাশও দেখাননি। একটাও হাড়জিরজিরে শরীর নয়। তিনি দেখালেন মাঠ ভরা সবুজ ধান। টকটকে কমলা আকাশ। পুকুরে স্নানরত মহিলার হাত জলের উপর ফুটে ওঠা পদ্মের মতো। আর ঠিক এই সৌন্দর্যের মাঝখানে ধীরে ধীরে মানুষ খেতে পাচ্ছে না।

সমালোচক পলিন কেল লিখেছিলেন, মহিলারা “পাতলা, ভেজা শাড়িতে বাতাসে রঙিন ঢেউ তুলছেন” — এই দৃশ্য এবং তার পাশে ক্ষুধার বাস্তবতা একসাথে রেখে রায় এমন একটা আঘাত করেছেন যা কোনো বীভৎস দৃশ্য কখনো করতে পারত না।

ছবির শেষে পর্দায় লেখা আসে ঠান্ডা ভাষায় — পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ মরেছে। এই মৃত্যু মানুষের হাতে তৈরি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অব্যবস্থাপনা। যুদ্ধের জন্য সম্পদ সরিয়ে নেওয়া। কবিতার মতো ছবির পর এই নির্মম তথ্য যেন বুকে পাথর ছুড়ে দেয়।

মাটির দেবী, মাটির মানুষ

দেবী — ১৯৬০ সালের ছবি। দয়াময়ী সুন্দরী বধূ। শ্বশুর স্বপ্ন দেখেন সে কালীর অবতার। তারপর শুরু হয় অপমান — দেবী বানানোর মোড়কে মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া।

ছবির শুরুতে কালীপ্রতিমার চোখে কাজল পরানোর দৃশ্য দিয়ে রায় বলে দেন এই ছবির মূল কথা — মাটির মূর্তিকে যেভাবে তৈরি করা হয়, ঠিক সেভাবেই একজন জীবন্ত মেয়েকে তৈরি করা হয় পূজার জন্য।

এখানে রায়ের সমালোচনা ধর্মের নয়, মানসিকতার। একটা পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কীভাবে ভক্তির নামে একটি মেয়ের অস্তিত্বকে গ্রাস করে — এই প্রশ্নটা রায় ছুঁড়ে দেন দর্শকের মুখে। আজ ষাট বছর পরেও সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

যখন পৃথিবী তাঁর ছবি দেখল

আকিরা কুরোশাওয়া বলেছিলেন, “সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা না দেখে থাকা মানে সূর্য বা চাঁদ না দেখে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা।” এই কথা মনে হলে গায়ে কাঁটা দেয়। মার্টিন স্করসেজি বলেছেন, রায়ের অভিযান ছবিটা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল ট্যাক্সি ড্রাইভার বানাতে। তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে অপু ট্রিলজি পুনরুদ্ধার করেছেন। বলেছেন — “আমাদের সবাইকে সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখতে হবে, বারবার দেখতে হবে।”

ওয়েস অ্যান্ডার্সন যখন দার্জিলিং লিমিটেড বানাতে ভারতে এলেন, তখন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই রাজস্থানের মাটি বেছে নিলেন যেখানে রায় তাঁর সোনার কেল্লা বানিয়েছিলেন। আর রায়ের সুরকেই রাখলেন তাঁর ছবিতে। একজন বাঙালি পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর সংগীত, তাঁর আলো — আজও হলিউডের ছবিতে বেঁচে আছে।

আরো পড়ুন:  রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু রহস্য: প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন সৌরভ পালোধি

১৯৯২ সালে যখন অস্কার সম্মাননা দেওয়া হয় সত্যজিৎ রায়কে, তখন তিনি হাসপাতালে শুয়ে। অডরে হেপবার্ন ট্রফি নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর কাছে। সেই ট্রফি হাতে নিয়ে যে কথা বললেন রায়, তার মধ্যে কোনো গর্ব ছিল না — ছিল শুধু কৃতজ্ঞতা, বাংলার মাটির প্রতি, বাংলার মানুষের প্রতি।

আমরা যা বুঝতে পারিনি

সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কোনো খলনায়ক নেই। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন — মানুষ জন্মগতভাবে খারাপ নয়। সে খারাপ হয় তার পরিস্থিতির কারণে। দারিদ্র্য, সামাজিক কাঠামো, ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা — এই শক্তিগুলো মানুষকে ভেঙে দেয়। হরিহর কী দোষী? না। সে শুধু একজন অসহায় পিতা। সর্বজয়া কি ভুল করেছে? হয়তো করেছে। কিন্তু সে তার কঠিন জীবনের মাঝে বেঁচে ছিল। দুর্গা কেন মারা গেল? কারণ একটা গরীব পরিবারে ঠিকমতো চিকিৎসা হয়নি। এটাই নির্মম সত্য। কিন্তু রায় এই নির্মমতাকে দেখিয়েছেন সৌন্দর্যের মোড়কে। কারণ জীবন এরকমই — কষ্ট আর সৌন্দর্য পাশাপাশি থাকে। দুঃখ আর আনন্দ একই মুহূর্তে শ্বাস নেয়।

শান্তিনিকেতনে পড়াকালীন রায় যে দর্শন শিখেছিলেন — ক্ষুদ্রের মধ্যে বিশ্বকে দেখা — সেটাই তাঁর ছবির ভিত্তি। একটা ঘাসের ডগার শিশিরবিন্দুতে পুরো মহাকাশের প্রতিফলন দেখা যায় — এই সত্যটাই রায় সারাজীবন বলার চেষ্টা করেছেন।

মাটির ঋণ

রায় একবার বলেছিলেন — একটি ছবি বিনা সংগীতেও চলতে পারে, যদি তুমি পৃথিবীর শব্দ ঠিকমতো তুলতে পারো। বাতাসে পাতার কথা। বৃষ্টির শব্দ। রাতের পোকার গান। গরুর গলার ঘণ্টা। এইগুলোই তাঁর কাছে সংগীত।

এই শোনার ক্ষমতা, এই দেখার ক্ষমতা — এটাই সত্যজিৎ রায়কে অন্য সবার থেকে আলাদা করে।
আজ যখন বাংলার গ্রামের কথা ভাবি, চোখের সামনে যে ছবি ভাসে তার অনেকটাই রায়ের তোলা। সেই কাশবন, সেই পুকুরঘাট, সেই বৃষ্টিভেজা মেঠো পথ — এগুলো শুধু স্থান নয়, এগুলো আমাদের স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।

একজন মানুষ যদি এতটুকু করতে পারেন — একটা জাতির স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে নিজের দৃষ্টিকে রেখে আসতে পারেন — তাহলে তাঁকে আর মৃত বলা যায় না।

সত্যজিৎ রায় মাটিতে মিশে গেছেন। কিন্তু যে মাটির কথা তিনি বলেছিলেন, সেই মাটি এখনো তাঁকে ধরে রেখেছে। বাংলার প্রতিটি কাশফুল আজও তাঁর কথা মনে রাখে।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Demo Ad
Sponsored Links

Most Popular

Recent Comments