নিজস্ব সংবাদদাতা: ভারতের চিত্রসাংবাদিকতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম রঘু রাই। তাঁর ক্যামেরা শুধু মুহূর্ত বন্দি করেনি, বরং সময়, সমাজ ও ইতিহাসকে গভীর সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছে। তাঁর জীবন ও কাজ এমনভাবে ভারতের সঙ্গে জড়িয়ে যে, একটিকে ছাড়া অন্যটি যেন অসম্পূর্ণ।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল, ৮৩ বছর বয়সে এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি আলোকচিত্রী। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে শিল্প ও সাংবাদিকতার জগতে।
রঘু রাই বিশ্বাস করতেন, ভাষা অনেক সময় সত্যকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু ছবি কখনো মিথ্যা বলে না। তাঁর ছবিতে যেমন আশার আলো দেখা যায়, তেমনই ধরা পড়ে গভীর বেদনা—তবে সর্বত্রই থাকে সত্যের নির্ভীক উপস্থিতি।
তাঁর লেন্সে উঠে এসেছে দালাই লামার আধ্যাত্মিক প্রশান্তি, মাদার টেরেসার মানবসেবা, সত্যজিত রায়ের সৃজনশীলতা এবং ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। একই সঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবন—এক অন্ধ ভিক্ষুকের সংগ্রাম কিংবা চলন্ত ট্রেনে চা বিক্রেতার ঝুঁকিপূর্ণ দিনযাপন, যা সমাজের বাস্তব চিত্রকে সামনে আনে।
১৯৬৬ সালে The Statesman পত্রিকায় তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু। পরে Sunday ও India Today-এর সঙ্গেও যুক্ত থাকলেও তিনি সবসময় নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
বিশ্বখ্যাত ফটোগ্রাফার Henri Cartier-Bresson তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ১৯৭৭ সালে তাঁকে Magnum Photos-এ যোগদানের জন্য মনোনীত করেন, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
হিমালয় থেকে গঙ্গার তীর, বারাণসীর ঘাট থেকে কলকাতার অলিগলি—ভারতের নানা প্রান্তে তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন জীবনের গভীরতা। তাঁর ক্যামেরায় ধরা Varanasi-র ঘাটে এক অনন্ত শান্তির অনুভূতি যেমন আছে, তেমনই কলকাতায় মাদার টেরিজা-র জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত দর্শকের মনে মানবতার নতুন উপলব্ধি জাগিয়ে তোলে।
১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তাঁর ক্যামেরায় যে শক্তিতে উঠে এসেছে, তা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। সেই ছবিগুলি আজও মানবিক বিপর্যয়ের নির্মম দলিল হিসেবে বিবেচিত।
রঘু রাই প্রায় ২০টিরও বেশি ফটোবুক প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে Indira Gandhi: A Living Legacy, Raghu Rai’s India, Mother Teresa, Delhi, Banaras: A Portrait of a Civilization উল্লেখযোগ্য।
১৯৭২ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়েছে লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে।
তিনি ছিলেন একাধারে শিল্পী, ইতিহাসের ভাষ্যকার এবং মানবতার নীরব সাক্ষী। রঘু রাই একবার বলেছিলেন, “আমার ক্যামেরা ছাড়া আমি কিছুই না।” তাঁর কাছে ফটোগ্রাফি ছিল সময়কে থামিয়ে রাখার এক অনন্ত প্রয়াস।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর তোলা ছবিগুলি বেঁচে থাকবে চিরকাল—ভারতের গল্প, মানুষের গল্প আর সময়ের গল্প বলে। তাঁর ক্যামেরা থেমে গেলেও, তাঁর ফ্রেমে বন্দি ইতিহাস কখনো থামবে না।

Recent Comments