পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের (West Bengal Assembly Election) অন্তিম দফার ভোটগ্রহণের আগে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) নিরপেক্ষতা নিয়ে ফের একবার বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল রাজ্যের শাসকদল। খোদ কমিশন নিযুক্ত পুলিশ পর্যবেক্ষকের সঙ্গে এক বিজেপি প্রার্থীর ‘গোপন আঁতাঁত’-এর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এনেছে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। শুধু অভিযোগ তোলাই নয়, এই ঘটনার বিচার চেয়ে এবার সরাসরি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তারা।
গত রবিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় একটি মেগা রোড শো ও প্রচার সভা করেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সভা থেকেই তিনি এক বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন। অত্যন্ত চড়া সুরে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “ভেবেছিল চুপিচুপি মিটিং করবে, আর কেউ জানবে না। আরে ডায়মন্ড হারবারের আকাশে-বাতাসে, লতায়-পাতায় আমি আছি। যে পুলিশ অবজার্ভার এই কাজ করেছে, তাঁকে টানতে টানতে কোর্টে নিয়ে যাব।” অভিষেকের সেই কড়া বার্তার রেশ কাটতে না কাটতেই, সোমবার হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করল ঘাসফুল শিবির।
নিউজস্কোপ বাংলার নিজস্ব তথ্যানুসন্ধান এবং শাসকদলের দায়ের করা মামলার বয়ান অনুযায়ী, এই গোটা বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে গত ২০ এপ্রিলের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা। ওইদিন নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত আইপিএস অফিসার পরমার স্মিথ পরসোত্তমদাস এবং মগরাহাট পশ্চিমের (Magrahat West) বিজেপি প্রার্থী গৌর ঘোষের মধ্যে একটি গোপন বৈঠক হয় বলে অভিযোগ। তৃণমূলের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী ওই পুলিশ পর্যবেক্ষকের আলিপুরের আইপিএস মেসে থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনি সরকারি বাসভবন এড়িয়ে ডায়মন্ড হারবারের সাগরিকা ট্যুরিস্ট লজে গিয়ে ওঠেন। সেখানেই অত্যন্ত সন্তর্পণে বিজেপি প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়।
এই অভিযোগের স্বপক্ষে ওই ট্যুরিস্ট লজের সিসিটিভি ফুটেজও প্রকাশ্যে এনেছে শাসকদল (যদিও নিউজস্কোপ বাংলা স্বাধীনভাবে ওই ফুটেজের সত্যতা যাচাই করেনি)। তৃণমূলের বক্তব্য, দক্ষিণ ২৪ পরগনার চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতা রক্ষার গুরুদায়িত্ব রয়েছে এই উচ্চপদস্থ আইপিএস অফিসারের কাঁধে। একজন রেফারির ভূমিকায় থাকা কমিশন প্রতিনিধির যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর সঙ্গে এমন গোপন যোগাযোগ থাকে, তবে তা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই ধরনের ঘটনা সাধারণ ভোটারদের মনে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করে।
আদালতে দায়ের করা মামলায় শাসকদলের আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ওই পুলিশ আধিকারিক নিজের নির্ধারিত সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে ট্যুরিস্ট লজে রাত কাটালেন? আর কেনই বা সেই একই সময়ে সেখানে বিজেপি প্রার্থীর রহস্যজনক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেল? এই পুরো ঘটনাটির নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের ভরা মরশুমে খোদ নির্বাচন কমিশনের একজন পদস্থ পর্যবেক্ষকের বিরুদ্ধে এমন সরাসরি অভিযোগ এবং সিসিটিভি ফুটেজ হাতিয়ার করে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা বঙ্গ রাজনীতিতে কার্যত নজিরবিহীন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল, এখন সকলেরই নজর কলকাতা হাইকোর্টের দিকে। মহামান্য আদালত এই অভিযোগের ভিত্তিতে কী নির্দেশ দেয় এবং নির্বাচন কমিশন তাদের এই বিতর্কিত আধিকারিকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে কি না, সেটাই এখন সবথেকে বড় কৌতূহলের বিষয়।

Recent Comments