পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পারদ যত চড়ছে, প্রচারের ময়দানে রাজনৈতিক দলগুলোর উন্মাদনাও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে বাইক মিছিল। পাড়ায় পাড়ায় এই বাইক-দাপট রুখতে প্রথম থেকেই কড়া অবস্থান নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (Election Commission)। কিন্তু সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের একটি সিঙ্গল বেঞ্চ কমিশনের সেই নির্দেশিকায় কিছুটা শিথিলতা এনেছিল। এবার সেই রায়কেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সরাসরি ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হল কমিশন।
রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে নির্বাচনের সময় বাইক মিছিল ঘিরে অশান্তির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। হুডখোলা জিপ বা পদযাত্রার পাশাপাশি গত কয়েক দশকে বাইক মিছিল প্রচারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই বাইক মিছিলের আড়ালেই অনেক সময় এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়। হেলমেটবিহীন একদল যুবকের বেপরোয়া বাইক চালানো, মুহুর্মুহু স্লোগান এবং বিরোধী দলের সমর্থকদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা আকছার ঘটে। বিশেষ করে ভোটের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে এই ধরনের জমায়েত সাধারণ ভোটারদের মনে প্রবল আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, এমনটাই মনে করে কমিশন। সেই কারণে, ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই ধরনের মিছিলের উপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
তবে কমিশনের এই নির্দেশিকার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের হলে, বিচারপতির সিঙ্গল বেঞ্চ তাতে কিছুটা সংশোধন করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল যে, ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে বাইকের ওপর ঢালাও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়তো পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত নয়। সিঙ্গল বেঞ্চের এই রায়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো, কারণ শেষ মুহূর্তের জনসংযোগ ও কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে বাইক তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রচার মাধ্যম।
কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড়। তাদের মতে, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সুনিশ্চিত করতে গেলে ভোটের ঠিক আগের দিনগুলোতে এলাকায় সম্পূর্ণ শান্ত পরিবেশ বজায় রাখা অপরিহার্য। সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ের ফলে যদি বাইক মিছিল করার ন্যূনতম সুযোগও থেকে যায়, তবে তা কাজে লাগিয়ে দুষ্কৃতীরা ভোটারদের প্রভাবিত বা ভয় দেখাতে পারে বলে আশঙ্কা কমিশনের আধিকারিকদের। এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নিতে নারাজ তারা। আর সেই কারণেই কালবিলম্ব না করে সোমবার সকালেই হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করেছে তারা।
নিউজস্কোপ বাংলার সূত্র অনুযায়ী, সোমবার দুপুর ১২টা নাগাদ এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এই শুনানির দিকেই এখন তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের সমস্ত রাজনৈতিক মহল। কারণ, ডিভিশন বেঞ্চ যদি কমিশনের পক্ষেই রায় দেয়, তবে আগামী দফাগুলোর আগে প্রচারের রণকৌশলে বড়সড় বদল আনতে বাধ্য হবে সমস্ত রাজনৈতিক দল।
সাধারণ ভোটারদের একাংশের মতে, নির্বাচনের সময় এই বাইক বাহিনীর দাপাদাপিতে এলাকায় চরম যানজট ও শব্দদূষণ তৈরি হয়। বয়স্ক এবং শিশুদের ক্ষেত্রে যা প্রবল শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই অনেকেই কমিশনের এই কড়া পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। এখন দেখার, কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে নির্বাচন কমিশনের আবেদন মঞ্জুর করে কি না।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশন বনাম আদালতের এই আইনি লড়াই বিধানসভা নির্বাচনের আবহে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারের স্বাধীনতা জড়িয়ে রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টি। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপর ভিত্তি করেই ঠিক হবে আগামী দিনগুলোতে বাংলার ভোটের ময়দান কতটা শান্ত থাকবে।

Recent Comments