ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার জগতে ফের নেমে এল শোকের ছায়া। প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। রবিবার সকালে কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮৭ বছর বয়সি এই শিল্পী। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। পাশাপাশি মূত্রনালির সংক্রমণেও ভুগছিলেন। ষষ্ঠীর দিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে ভারতীয় শিল্পজগতে তৈরি হল এক অপূরণীয় শূন্যতা। তাঁর শিল্পকর্মের মধ্যে ফুটে উঠত মানুষের যন্ত্রণা, জীবনের জটিলতা, শরীরের নানা ভঙ্গি এবং সমাজের অসংগতি। দেশভাগের কারণে উদ্বাস্তু জীবনের যে অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে এসেছিল, তা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল তাঁর শিল্পীসত্তাকে। সেই অভিজ্ঞতা ও মানুষের জীবনের নানা টানাপোড়েনই হয়ে উঠেছিল তাঁর ছবির অন্যতম প্রধান বিষয়।
১৯৩৯ সালে অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুরের দহরপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন যোগেন চৌধুরী। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। পরিবারের মধ্যেই তাঁর শিল্পীসত্তার পরিচয় প্রথম ধরা পড়ে। কলকাতায় নিজের বাড়ির দেওয়ালে ময়ূরের ছবি এঁকেই শুরু হয়েছিল তাঁর শিল্পচর্চার যাত্রা। পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহই তাঁকে ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম স্বতন্ত্র শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
১৯৬০ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন প্যারিসে। সেখানে Ecole des Beaux-Arts এবং উইলিয়াম হেটারের বিখ্যাত Atelier 17-এ শিল্পচর্চার সুযোগ পান। ইউরোপীয় শিল্পশৈলীর সঙ্গে পরিচয় তাঁর আঁকার ধরনে নতুন মাত্রা যোগ করে। তবে বিদেশে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করলেও বাংলার মাটি, মানুষের জীবন এবং দেশভাগের স্মৃতি তাঁর সৃষ্টির অন্যতম অনুপ্রেরণা হয়ে থেকেছে।
যোগেন চৌধুরীর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সূক্ষ্ম রেখার ব্যবহার। রেখার জাল বুনে তিনি মানুষের শরীর ও মুখের নানা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর আঁকা মুখগুলিতে কখনও ধরা পড়ত যন্ত্রণা, কখনও অসহায়তা, আবার কখনও জীবনের প্রতি গভীর মমতা। সাধারণ মানুষের শরীরী ভাষা ও মনস্তত্ত্বকে এমন নিজস্ব ভঙ্গিতে প্রকাশ করার ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। নারী, দম্পতি এবং গণেশের মতো বিষয়ও বারবার ফিরে এসেছে তাঁর শিল্পকর্মে।
শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, শিক্ষক ও শিল্পসংস্কৃতির সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন যোগেন চৌধুরী। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অধ্যাপনা করেন এবং সেখানকার প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন পদ্মভূষণ-সহ একাধিক সম্মান। ফ্রান্সের প্রিক্স দে লা জঁ পেন্তুর এবং ললিতকলা অ্যাকাডেমির স্বীকৃতিও তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি।
২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল শিল্পীসত্তা। সমাজ ও রাজনীতির নানা অসংগতি তাঁর ব্যঙ্গাত্মক চিত্রকলায় উঠে এসেছে বারবার। নিজের শিল্পের মধ্য দিয়েই তিনি সময়, সমাজ এবং মানুষের জীবনকে দেখার এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন।
কলকাতায় তাঁর নিজের হাতে গড়ে তোলা ‘চারুবাসনা দ্য যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’ ছিল তাঁর স্বপ্নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর প্রয়াণে সেই শিল্পভাবনার উত্তরাধিকার আরও যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এল।
একটি সময়ের অভিজ্ঞতা, দেশভাগের ক্ষত এবং মানুষের জীবনের নানা অনুভূতিকে ক্যানভাসে ধরে রেখেছিলেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর শারীরিক উপস্থিতি আর রইল না, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে যাবে ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে। রেখার পর রেখায় মানুষের যে গল্প তিনি বলে গিয়েছেন, তা আগামী প্রজন্মের শিল্পপ্রেমীদের কাছেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।


Recent Comments