বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলির সুযোগ রাখা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ (প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী বিল, ২০২৬-এ। এই বিল নিয়ে আপত্তি জানিয়ে রাজ্যের রাজ্যপাল তথা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের কাছে চিঠি দিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০১ জন শিক্ষক।
১৪ সেপ্টেম্বর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (JUTA)-র পক্ষ থেকে রাজ্যপালকে এই প্রতিনিধিত্বপত্র দেওয়া হয়। সেখানে সংশোধনী বিলের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আপত্তি জানিয়ে শিক্ষকদের বদলির নীতি প্রত্যাহারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
JUTA-র বক্তব্য, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন, বিধি এবং পরিষেবা সংক্রান্ত নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়মের ভিত্তিতেই শিক্ষক ও কর্মীদের নিয়োগ করা হয়। নিয়োগের সময় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বদলির কোনও শর্ত উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে একজন শিক্ষককে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করা হলে তা পরিষেবার প্রচলিত শর্তের সঙ্গে অসঙ্গত হতে পারে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, কর্মস্থল পরিবর্তনের ফলে শিক্ষকদের গবেষণা, শিক্ষাদান এবং দীর্ঘমেয়াদি অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে গবেষণা প্রকল্পের ক্ষেত্রে গবেষণাগার, যন্ত্রপাতি, গ্রন্থাগার এবং সংশ্লিষ্ট গবেষক দলের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনও শিক্ষক বা গবেষণা প্রকল্পের প্রধানকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করা হলে সেই গবেষণা পরিকাঠামো ও গবেষক দলের সমন্বয় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে JUTA-র দাবি।
পিএইচডি গবেষণার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষক ও গাইডের নিয়মিত যোগাযোগ এবং একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়েছে, শিক্ষক বদলি হলে চলমান ডক্টরাল গবেষণার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিজস্ব পাঠক্রম ও শিক্ষাদানের পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষকদের বদলির বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছে JUTA। তাদের বক্তব্য, প্রতিটি বিভাগের পাঠক্রম তৈরি হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিশেষজ্ঞতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অ্যাকাডেমিক পরম্পরার ভিত্তিতে। ফলে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি হলে শিক্ষক ও পড়ুয়া—উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হতে পারে।
চিঠিতে অবশ্য পিছিয়ে থাকা বা পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সহযোগিতা করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হয়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদি বদলির পরিবর্তে কয়েক সপ্তাহ বা এক মাসের মতো স্বল্পমেয়াদি দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সেই সহযোগিতা করা যেতে পারে বলে মত JUTA-র।
শিক্ষকদের আরও দাবি, কর্মস্থলের স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে উচ্চমানের শিক্ষক ও তরুণ গবেষকরা পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জন্য আবেদন করতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এর ফলে রাজ্যের উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক মানও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভিডেন্ট ফান্ড সংক্রান্ত আইন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশোধিত আইনের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষক সমিতি। একইসঙ্গে, সরকারের নীতির সমালোচনা করা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বদলির ক্ষমতা ব্যবহার করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সবশেষে, কর্মস্থলের নিশ্চয়তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে JUTA-র পক্ষ থেকে রাজ্যপালের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে, যাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলির নীতি প্রত্যাহার করে। চিঠির সঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০১ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকার স্বাক্ষর সংযুক্ত করা হয়েছে।


Recent Comments