পশ্চিম এশিয়া (West Asia)-এর মাটিতে শুরু হওয়া সংঘাত এখন আর কেবল ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বে এক ভয়াবহ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বিগত এক সপ্তাহ ধরে চলা ইরান (Iran) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States)-এর মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবার দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করল। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়তে চলেছে ভারত (India)। সংঘাতের আঁচ কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা বর্তমান পরিস্থিতি থেকেই স্পষ্ট।
কোচিতে নোঙরের অনুমতি এবং ভারতের অবস্থান
ভারতীয় প্রশাসনিক ও সরকারি সূত্রের খবর অনুযায়ী, মার্কিন হামলায় শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka)-র উপকূলে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইরিস দেনা’ (Iris Dena) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঠিক কয়েকদিন আগেই নয়াদিল্লির কাছে সাহায্য চেয়েছিল তেহরান (Tehran)। জানানো হয়েছে, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে অপর একটি ইরানি নৌযান ‘আইরিস লভন’ (Iris Lavan)-কে কোচি (Kochi) বন্দরে জরুরি ভিত্তিতে নোঙর করার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। এই চাঞ্চল্যকর খবর সামনে আসার পর থেকেই সাউথ ব্লক ও কূটনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিকামী ভূ-রাজনীতিতে এই ঘটনার প্রভাব যে কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই ধরনের সামরিক তৎপরতা নয়াদিল্লির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
আমেরিকার কড়া হুঁশিয়ারি
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের সুর আরও চরম আকার ধারণ করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের সাথে কোনো রকম মধ্যস্থতা বা চুক্তিতে যাবে না আমেরিকা; একমাত্র নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের সামনে আর অন্য কোনো পথ খোলা নেই। তাঁর এই কড়া ও আপসহীন বার্তার পর যুদ্ধের ময়দানে উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থান বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, আমেরিকা এই সংঘাতে কোনোভাবেই পিছু হটতে রাজি নয়।
ইজরায়েলের ভয়াবহ আক্রমণ ও লেবানন পরিস্থিতি
ইজরায়েল (Israel)-ও তাদের সামরিক অভিযান আরও কয়েক ধাপ জোরদার করেছে। ইজরায়েলি সেনার শীর্ষ নেতৃত্বের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের প্রায় ৫০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তেহরানের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অত্যন্ত ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। উল্লেখ্য, এই সুরক্ষিত বাঙ্কারটিতেই একসময় আশ্রয় নিয়েছিলেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই (Ayatollah Ali Khamenei), যাঁকে ইতিমধ্যেই এক গুপ্তহত্যায় খতম করা হয়েছে বলে খবর। ইজরায়েলের দাবি, এখনও ওই বাঙ্কারটি শীর্ষ প্রশাসনিক ও সামরিক আধিকারিকরা নিজেদের গোপন কাজের জন্য ব্যবহার করছেন।
এর পাশাপাশি, লেবানন (Lebanon) সীমান্তেও ইজরায়েলি ট্যাঙ্কের আনাগোনা ও সামরিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। হিজবুল্লাহ (Hezbollah)-র বিরুদ্ধে ইজরায়েলের লাগাতার এবং বিধ্বংসী আক্রমণ ক্রমশ তীব্রতর হয়েছে। লেবানন প্রশাসনের দেওয়া সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই একতরফা হামলায় এখনও পর্যন্ত ২১৭ জন সাধারণ নাগরিক ও যোদ্ধা নিহত এবং অন্ততপক্ষে ৭৯৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের এই বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলিও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইরানের প্রত্যাঘাত এবং জনবিক্ষোভ
তবে এত ক্ষয়ক্ষতির পরেও তেহরান একেবারেই হাত গুটিয়ে বসে নেই। তাদের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি (IRGC) দাবি করেছে, কুয়েত (Kuwait)-এ অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিতে তারা ইতিমধ্যেই নিখুঁত ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং এই মারণ ড্রোনগুলি সম্পূর্ণ অজানা অবস্থান থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আগামী দিনে তারা শত্রুপক্ষের ওপর আরও জোরালো প্রত্যাঘাত করবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
দেশের শীর্ষ ধর্মীয় নেতার মৃত্যু এবং মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলার প্রতিবাদে শুক্রবার জুম্মার নমাজের পর তেহরানের রাস্তায় শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষ জমায়েত হয়ে এক বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সাধারণ নাগরিকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত এবং আবেগপূর্ণ প্রতিবাদ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, দেশের ভেতরেও যুদ্ধের আগুন সমানে জ্বলছে এবং মানুষ কোনোভাবেই এই আক্রমণ সহজে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
ইউরোপের সতর্কতা
পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে যে, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলিও নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। ফ্রান্স (France) ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রেখে ভূমধ্যসাগর (Mediterranean)-এ একটি সামরিক হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার বা যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননের উপকূলেও ফরাসি নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে অনুরূপ একটি বিশাল জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে।
