বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্তাদের আকাশছোঁয়া বেতন নিয়ে বরাবরই সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল থাকে। তবে এবার সব জল্পনা এবং রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেলেন গুগল (Google) -এর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বা সিইও সুন্দর পিচাই (Sundar Pichai)। আগামী তিন বছরের জন্য তাঁকে এক চোখধাঁধানো নতুন বেতন প্যাকেজ উপহার দিল গুগলের পেরেন্ট বা মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট (Alphabet)। সংস্থার তরফ থেকে জানানো হয়েছে, শর্তসাপেক্ষে এবং কোম্পানির সার্বিক পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে আগামী তিন বছরে এই প্যাকেজের সর্বোচ্চ মূল্য দাঁড়াতে পারে ৬৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৫,৭০০ কোটি টাকারও বেশি)। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক প্রাপ্ত সিইও-দের তালিকায় নিজের জায়গা আরও পাকাপোক্ত করলেন ৫৩ বছর বয়সি এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত।
কী কী রয়েছে এই চোখধাঁধানো প্যাকেজে? পিচাইয়ের এই বিপুল পারিশ্রমিকের মূল কাঠামোটি দাঁড়িয়ে রয়েছে মূলত পারফরম্যান্স স্টক ইউনিট বা পিএসইউ (PSU) -এর ওপর। প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এই স্টকের মূল্য ১২৬ মিলিয়ন ডলার। তবে এসঅ্যান্ডপি ১০০ (S&P 100) -এর অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য কোম্পানিগুলির তুলনায় অ্যালফাবেট যদি শেয়ারহোল্ডারদের বেশি রিটার্ন দিতে পারে, তবে এই স্টকের মূল্য দ্বিগুণ হয়ে ২৫২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি, আগামী তিন বছর তিনি কোম্পানিতে বহাল থাকলে প্রায় মাসিক ভিত্তিতে মোট ৮৪ মিলিয়ন ডলারের রেস্ট্রিক্টেড স্টক পাবেন। এর বাইরে তাঁর বাৎসরিক স্থায়ী বেতন (Annual Salary) হিসেবে ধার্য করা হয়েছে ২ মিলিয়ন ডলার।
নতুন স্টার্টআপ থেকে বাড়তি লাভ: এই প্রথমবারের মতো সুন্দর পিচাইয়ের বেতন প্যাকেজে গুগলের দু’টি বিশেষ প্রজেক্টের স্টকের অংশ যোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুগলের স্বয়ংক্রিয় বা চালকবিহীন ট্যাক্সি প্রকল্প ওয়েইমো (Waymo) এবং ড্রোন ডেলিভারি স্টার্টআপ উইং (Wing)। আগামী তিন বছরের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ওয়েইমো থেকে ১৩০ মিলিয়ন ডলার এবং উইং থেকে ৪৫ মিলিয়ন ডলারের স্টক পাওয়ার সুযোগ থাকছে তাঁর সামনে। অ্যালফাবেটের বোর্ডের মতে, স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং এবং ডেলিভারির মতো চ্যালেঞ্জিং খাতে এই দুই প্রজেক্ট পিচাইয়ের তত্ত্বাবধানে দারুণ উন্নতি করেছে। তাই তাঁকে আরও উৎসাহিত করতেই এই নয়া পদক্ষেপ।
কেন এই বিপুল অঙ্কের পুরস্কার? প্রাক্তন ম্যাককিনসে (McKinsey) কনসালট্যান্ট সুন্দর পিচাই ২০০৪ সালে গুগলে যোগ দেন এবং ক্রোম ব্রাউজার ও অ্যান্ড্রয়েড ডিভিশনের নেতৃত্ব দিয়ে নিজের জাত চেনান। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে যখন তিনি সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন গুগলের বাজার মূলধন (Market Cap) ছিল ৫৩৫ বিলিয়ন ডলার। আজ তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে তা প্রায় সাত গুণ বেড়ে ৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে (এমনকি জানুয়ারিতে তা ৪ ট্রিলিয়নও ছুঁয়েছিল)।
সম্প্রতি চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) -র মতো এআই (AI) টুল বাজারে আসার পর গুগল কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল বলে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পিচাই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অত্যাধুনিক এআই মডেল বাজারে এনে এবং সেগুলিকে গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত করে সেই ধাক্কা সামলে নিয়েছেন। এছাড়া গুগলের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অ্যান্টিট্রাস্ট (Antitrust) বা একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগও তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে সামলেছেন।
অন্যান্য টেক জায়ান্টদের তুলনায় পিচাই কোথায়? পিচাইয়ের এই বিপুল আয়ের পরিসংখ্যান আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা অন্যান্য প্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের দিকে তাকাই। ২০২৫ অর্থবর্ষে মাইক্রোসফট (Microsoft) -এর সিইও সত্য নাদেলা (Satya Nadella) -র মোট আয় ছিল ৯৬.৫ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, অ্যাপল (Apple) -এর বস টিম কুক (Tim Cook) ২০২৫ সালে আয় করেছেন ৭৪.৩ মিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, বর্তমান প্রযুক্তি বিশ্বে সুন্দর পিচাইয়ের কদর ঠিক কতটা!
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পিচাই এবং তাঁর স্ত্রী অঞ্জলির কাছে বর্তমানে গুগলের প্রায় ১.৬৭ মিলিয়ন শেয়ার রয়েছে, যার বাজারদর প্রায় ৪৯৮ মিলিয়ন ডলার। এছাড়াও তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য কোম্পানি গত বছর ৮.৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। একজন সাধারণ ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে মেধা ও পরিশ্রমের জোরে প্রযুক্তি বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর এই গল্প সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
