মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (US) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) সম্প্রতি একটি জনসভায় ইরান (Iran) নিয়ে বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেছেন। কেন্টাকি (Kentucky) প্রদেশের হেব্রন (Hebron) শহরে একটি প্যাকেজিং প্ল্যান্টের ভেতরে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে তিনি দাবি করেন যে, চলমান যুদ্ধে আমেরিকা ইতোমধ্যেই জয়লাভ করেছে এবং শত্রুদের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে। তবে তার সাথেই তিনি যোগ করেন, “আমরা এখনই তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে চাই না, তাই না? আমরা প্রতি দুই বছর অন্তর সেখানে ফিরে যেতে চাই না। আমরা এই কাজ পুরোপুরি শেষ করব।”
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতি, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং চলমান এই সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের ওপর ক্রমশ চাপ বাড়ছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প তার শত শত উন্মত্ত সমর্থকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান, “তাদের ড্রোনগুলোর ৮৫ শতাংশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং আমরা তাদের কারখানাগুলো উড়িয়ে দিচ্ছি। তারা নিজেরাও জানে না যে তাদের ওপর কী আঘাত হেনেছে।”
এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের (Israel) সাথে এই সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট (Chris Wright) একটি বড় ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ৩২টি দেশের সমন্বিত উদ্যোগে মোট ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এটি তারই অংশ। আগামী সপ্তাহ থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং প্রায় ১২০ দিন ধরে তা বাজারে সরবরাহ করা হবে।
এত পদক্ষেপ সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে (Middle East) তেলের ট্যাংকারে হামলার খবরের কারণে বাজারে অস্থিরতা এখনো কাটেনি এবং সাধারণ আমেরিকানরা এর চরম ভুক্তভোগী হচ্ছেন। মাত্র এক মাস আগে দেশটিতে গ্যাসের গড় দাম ছিল প্রতি গ্যালন ২.৯৪ ডলার, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৫৮ ডলারে।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বেশ উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেনেটের রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জন থুন (John Thune)-এর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছেন ট্রাম্প। ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত একটি বিল, যা মূলত নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনবে, সেটি পাসের জন্য তিনি থুনকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। ওয়াশিংটন (Washington)-এ হোয়াইট হাউস (White House)-এর বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এই বিলটি তার টেবিলে স্বাক্ষরের জন্য না আসা পর্যন্ত তিনি অন্য কোনো আইনে সই করবেন না। থুনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “তাকে একজন প্রকৃত নেতার মতো আচরণ করতে হবে।”
অন্যদিকে, সামরিক ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং বেদনাদায়ক তথ্য সামনে এসেছে। প্রাথমিক একটি মার্কিন সামরিক তদন্তে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে প্রাণঘাতী টমাহক মিসাইল হামলা হয়েছিল, তার পেছনে ওয়াশিংটনেরই দায় রয়েছে। এই হামলায় বহু শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। শাজারাহ তাইয়্যেবাহ (Shajarah Tayyebeh) নামের ওই স্কুলটিতে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে চরম ভুল হওয়ার কারণেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানা গিয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের গাফিলতির খবরও প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৩ সালে এক বিদেশি হ্যাকার নিউ ইয়র্ক (New York)-এ এফবিআই সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে প্রয়াত জেফরি এপস্টাইন (Jeffrey Epstein) সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপনীয় ফাইল চুরি করেছিল। তিন বছর আগের এই ঘটনাটি সম্প্রতি বিচার বিভাগের নথিপত্র ফাঁসের মাধ্যমে জনসমক্ষে এসেছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও উদ্বেগ বাড়ছে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আফ্রিকা (Africa) মহাদেশের গিনি-বিসাউ (Guinea-Bissau)-তে হওয়া একটি ‘অনৈতিক’ টিকার ট্রায়ালকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গবেষণার মডেল বা ‘প্রোটোটাইপ’ হিসেবে দেখা হতে পারে। রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র (Robert F Kennedy Jr), যিনি দীর্ঘদিন ধরে টিকার সমালোচক হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগের শীর্ষ পদে রয়েছেন, তার অধীনে এই ধরনের গবেষণা কতটা সুরক্ষিত থাকবে তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও পালাবদলের হাওয়া স্পষ্ট। ফেব্রুয়ারিতে মুদ্রাস্ফীতির হার ২.৪ শতাংশে স্থির থাকলেও যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। নিউ হ্যাম্পশায়ার (New Hampshire)-এর একটি বিশেষ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর জয় রিপাবলিকানদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি গত কিছুদিনে ডেমোক্র্যাটদের ২৮তম চমকপ্রদ জয়, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ‘ব্লু ওয়েভ’-এর ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাশাপাশি, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মাংস উৎপাদনকারী কোম্পানি জেবিএস ইউএসএ (JBS USA)-এর প্রায় ৩৮০০ কর্মী ধর্মঘটের পথে হাঁটতে চলেছেন, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে এই শিল্পে প্রথম বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ।

