Friday, March 13, 2026
Leaderboard Ad Space (728x90) - Responsive
Homeদেশইমপিচমেন্ট ⚖️ ইমপিচমেন্ট ⚖️ ইমপিচমেন্ট জ্ঞানেশ কুমারকে খোলা চিঠি

ইমপিচমেন্ট ⚖️ ইমপিচমেন্ট ⚖️ ইমপিচমেন্ট জ্ঞানেশ কুমারকে খোলা চিঠি

অশোক সেনগুপ্ত

শ্রীযুক্ত জ্ঞানেশ কুমার
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
নির্বাচন সদন, নয়াদিল্লি।

শ্রদ্ধেয় মহাশয়,

আপনি সবে ঘুরে গেলেন কলকাতা থেকে। স্বল্প সময়ের জন্য আপনাকে কাছ থেকে দেখেছি। আপনার ব্যক্তিত্ব, বাচনভঙ্গী, শব্দচয়ণ, শারীরিক অনুভূতি, আমতা আমতা করে জবাব দেওয়ার চেষ্টার দায়ে আমলাদের মজাদার ঠুকনি— এ সবই লক্ষ্য বা অনুভব করেছি। আপনি নায়ক, না খলনায়ক, আপনি প্রবীণদের স্মৃতিতে টিএন শেষনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন কিনা— সেই বিতর্কে যাব না। সে সবের জন্য বিশেষজ্ঞরা আছেন। আমি থাকছি ইমপিচমেন্ট নিয়েই!

রব উঠেছে আপনার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট-এর ব্যবস্থা করছে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। এই শব্দটার সঙ্গে তো আমজনতার প্রত্যক্ষ পরিচয় নেই! তাঁরা অনেকেই মনে করতে শুরু করেছেন, আপনার বিরুদ্ধে এসআইআর-এর অনিয়ম নিয়ে নিশ্চয়ই এমন প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, যেগুলো দাখিল করলে শ্রীঘরে যেতে হবে আপনাকে! কেউ কেউ উল্লাশ প্রকাশও শুরু করেছেন।

ইমপিচমেন্ট হলো রাষ্ট্রপ্রধান বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের, যেমন রাষ্ট্রপতির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলে প্রেসিডেন্ট), বিচারপতি প্রমুখের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য পদ থেকে অপসারণের একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এটি একটি বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মতো। অভিযোগ গঠন এবং বিচারের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁদের পদচ্যুত করা হয়। সিদ্ধান্ত নেয় আইনসভা।

ভারতীয় সংবিধানে (অনুচ্ছেদ ৬১) রাষ্ট্রপতিকে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে সংসদের যে কোনও কক্ষের মাধ্যমে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ায় যাওয়া যায়। এর জন্য ১৪ দিনের লিখিত নোটিশ এবং সংসদের মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়।

আইনগত ব্যখ্যাগুলো আপনি আমার চেয়ে শতগুন জানেন। তবু লিখলাম কারণ, এই লেখা কিছু প্রাজ্ঞ ব্যক্তি পড়লেও পাঠকদের সিংহভাগ হয়তো বাঁকুড়ার দিনমজুর, বা মুর্শিদাবাদের বিড়িশ্রমিক। তাঁরাও যাথে বুঝতে পারেন ব্যাপারটা কী, তার জন্যই এই গৌরচন্দ্রিকা।

ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ার কতগুলো ধাপ রয়েছে— ১. অভিযোগ: সংসদের বা আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিযোগ আনা হয়।
২. তদন্ত: একটি কমিটি অভিযোগ তদন্ত করে।
৩. ভোট: আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাস হয়।
৪. বিচার: উচ্চকক্ষ বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়।
৫. অপসারণ: দোষী সাব্যস্ত হলে উক্ত ব্যক্তি পদ হারান।

তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের বর্তমান আপনার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার তোড়জোড় শুরু করেছেন কদিন আগেই। ‘ইন্ডি’- জোটের শরিকদের সঙ্গে কথা বলে এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আরো পড়ুন:  কাটল আশঙ্কার মেঘ: যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতীয়দের দেশে ফেরাল বিভিন্ন উড়ান সংস্থা

গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সংসদের দুই কক্ষের দলীয় সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি। সূত্রের খবর, সেখানেই দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সাংসদদের নির্দেশ দেন, আপনার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করার কথা। বিরোধী দলের যত সাংসদের স্বাক্ষর দরকার, সেই কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে সংসদে এই প্রস্তাব আনা হতে পারে বলে খবর।

আপনার মতো সাংবিধানিক পদে কেউ থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনতে গেলে লোকসভায় অন্তত ১০০ জন এবং রাজ্যসভায় অন্তত ৫০ সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন। লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা ৪১ (মৌসম বেনজির নূর ইস্তফা দেওয়ার পরে) জন। ফলে সম মনোভাবাপন্ন দলগুলির কাছে তৃণমূলকে গিয়ে স্বাক্ষর চাইতে হবে। সেখানেও ‘কৌশল’ রয়েছে তৃণমূলের।

সাধারণ ভাবে তৃণমূল সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী মঞ্চ ‘ইন্ডিয়া’ভুক্ত দলগুলির টিকিটে নির্বাচিত সাংসদদের দ্বারস্থ হবে। তাঁরা সই করলে সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধিতার রাজনীতিতে তৃণমূলের উচ্চতা প্রতিষ্ঠিত হবে। আর না-করলে সংশ্লিষ্ট দলগুলির বিজেপি-বিরোধিতার ‘সদিচ্ছা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকবে তৃণমূলের।

আমি তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর কাছে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলাম। এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ওঁরা এক্কেবারে ভাবিত নয়। ওঁদের একমাত্র ভাবনা, নিজে বা নিজের লোক আগামী ভোটে প্রার্থী হতে পারবেন কি না। অন্যথায় কোন পথ নেবেন, ভাবনা সে সব নিয়েও। কারণ, ‘দেশের কাজ’ করতে না পারলে জল থেকে তোলা মাছের মতো অবস্থা হবে ওঁদের।

তৃণমূল নেতৃত্ব ভালোভাবেই জানে, ইমপিচমেন্ট করাতে গেলে যত সাংসদের সই দরকার, তা একেবারেই তৃণমূলের নেই। তাই গত কয়েক সপ্তাহ ওই দাবির পক্ষে হইচই না করে মুখ টিপে ছিলেন দলনেত্রী। এর মধ্যে কংগ্রেস লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনতেই আশার আলো দেখতে পেয়েছে তৃণমূল। স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার মতো সাংসদ কংগ্রেসেরও নেই। তাই তৃণমূল আগ বাড়িয়ে অভয় দিয়েছে, আমরা তো আছি!

আরো পড়ুন:  দক্ষিণে ফের 'হাত'-এর দাপট! তেলঙ্গানা পুরভোটে কংগ্রেসের Tsunami, তলিয়ে গেল বিজেপি

অভিষেকের বার্তা পেয়ে যারপরনাই খুশি কংগ্রেস। আবার রাহুল গান্ধী নাকি পাল্টা সৌজন্য দেখিয়ে জানিয়েছেন, ইমপিচমেন্ট প্রসঙ্গে তাঁরা তৃণমূলের পাশে দাঁড়াতে পারেন। এ সব কথাই আপনার জানা! আর এটাও আপনি জানেন, প্রস্তাব গৃহীত হলেও সংসদে তা পাশ করাতে যত সাংসদ দরকার, তা তৃণমূলের নেই।

তাহলে সংবাদমাধ্যমের একাংশ বিষয়টা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করছে কেন? এই প্রশ্ন করেছিলাম সিপিএম-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা রবীন দেবকে। গোড়াতেই বলেন, আরে ছাড় তো! এসব ওদের লোক দেখানো বাজার গরম করার চেষ্টামাত্র। কাল টিভি-র খবরে দেখলাম ধর্মতলার নাটক তুলে নিল! চেঁচাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট নাকি ওঁদের দাবি মেনে নিয়েছে! কোনটা মানল? উল্টে কান মলে দিয়েছে! সুপ্রিম কৌর্ট থেকে লাথি খেয়েছে!

রবীন দেবকে প্রশ্ন করলাম, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তো জ্ঞানেশ কুমারকে ইমপিচ করার কথা বলেছেন! অত্যন্ত সজ্জন রবীনবাবু আবেগের আতিশয্যে তৃণমূলনেত্রী সম্পর্কে ছাপার অযোগ্য কিছু বাক্য শোনালেন।

প্রাক্তন উপাচার্য, প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শুভ্রকমল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিষয়টা আলোচনার আগে প্রথমে প্রশ্ন করলাম, “ভোটে দাঁড়াচ্ছেন?” উনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “কেন, আমাকে কি কুকুরে কামড়েছে?” এর পর মূল প্রশ্নে তাঁর সুরও রবীন দেবের মতো। শুভ্রকমলবাবুর মতে, প্রথম রাউন্ডেই ভেস্তে যাবে এই ইমপিচমেন্টের দাবি। কোনও অঙ্ক ধোপে টিঁকবে না।

ভারতে ইমপিচমেন্টের অতীতের উল্লেখযোগ্য ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে শুভ্রকমলবাবু
বিচারপতি ভি. রামস্বামীর কথা জানান। ভারতের প্রথম সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি যাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। বিচার বিভাগীয় কমিটি তাঁকে ‘ইচ্ছাকৃত এবং চরম অপব্যবহারের’ জন্য দোষী সাব্যস্ত করলেও লোকসভায় প্রস্তাবটি খারিজ হয়।

প্রাক্তন বিচারপতি সৌমিত্র সেনের ইমপিচমেন্টও সাড়া জাগিয়েছিল। তার বৃত্তান্ত জানিয়ে শুভ্রকমলবাবু বললেন, তিনিও ওই বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে ছিলেন। ২০১০-এর ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতিদের তদন্ত কমিটি রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিটি অর্থের অপব্যবহার এবং হাইকোর্টে তথ্যের ভুল উপস্থাপনা— এই দুই কারণে বিচারপতি সেনকে দুটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। শেষ পর্যন্ত বিচারপতির পদ ত্যাগ করায়
ইমপিচমেন্টের হাত থেকে রক্ষা পান সৌমিত্র সেন।

আরো পড়ুন:  বাজেটের জবাবেও 'ভোটের অঙ্ক' নির্মলার! তামিলনাড়ু-বাংলার দিকে আঙুল তুলতেই পাল্টা খোঁচা ডেরেকের

১৭ আগস্ট, ২০১১ ছিল রাজ্যসভায় একটি ঐতিহাসিক দিন। এই দিনে, রাজ্যসভার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবং ভারতীয় সংসদের ইতিহাসে দ্বিতীয় মামলা হিসেবে, হাইকোর্টের একজন বিচারকের অপসারণের জন্য একটি প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন, আলোচনা হয়। অবশেষে ১৮ আগস্ট, ২০১১ তারিখে ভোটাভুটি হয়। হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের বিরুদ্ধে অপসারণের প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

২০১১-র অক্টোবর মাসে রাজ্যসভার তরফে এ নিয়ে একটা মোটা বই প্রকাশ করে। তাতে মুখবন্ধে রাজ্যসভার মহাসচিব ভি কে অগ্নিহোত্রী লেখেন, “আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা পৃথকীকরণের সাংবিধানিক পরিকল্পনায় রাষ্ট্রের এই তিনটি অঙ্গের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছে। তবে, সংবিধানে এমন কিছু বিধান রয়েছে যা প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারককে তার পদ থেকে অপসারণের জন্য সংসদকে তার সাংবিধানিক আদেশ প্রয়োগ করতে সক্ষম করে।

হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারককে অপসারণের প্রক্রিয়াটি বেশ শ্রমসাধ্য এবং দীর্ঘ। সাংবিধানিক এবং আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে যে বিচারকরা ন্যায়বিচার প্রদানের লক্ষ্যে ভয় বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই তাদের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান সংকলনের লক্ষ্য হল পাঠকদের কেবল হাইকোর্টের বিচারককে অপসারণের প্রক্রিয়ার সাথেই নয়, সম্পূর্ণরূপে পরিচিত করা।”

তাহলে জ্ঞানেশবাবু, আপনার বিরুদ্ধে আনা ইমপিচমেন্ট-এর ভাবনাও কি ওরকম হইচই ফেলতে পারে? প্রবীন রাজনীতিক রবীন দেব এই দাবিকে পাত্তাই দিলেন না! শুভ্রকমল মুখোপাধ্যায়ের মত দুঁদে ব্যক্তিত্বও এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন! আপনাকে গত ১০ মার্চ সাংবাদিক সম্মেলনে এই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। আপনি সরাসরি বলেছেন, আপনারা মান্যতা দেন সংবিধান এবে আইনের বইকে। রাজনীতিকদের অভিযোগের জবাব দেন না।

তৃণমূল অবশ্য মনে করে, সিইসি-র বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনলে সংসদীয় রাজনীতিতে বিজেপির স্বরূপও ‘উন্মোচিত’ করা যাবে। সেই সূত্রেই এই পথে এগোতে চাইছে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল। এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বাকি বিরোধী দলগুলি বিরোধিতা করলেও কেউই তৃণমূলের মতো সুর সপ্তমে তোলেনি।

শুভকামনা করছি। — অশোক সেনগুপ্ত।
১২-৩-২০২৬।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Demo Ad
Sponsored Links

Most Popular

Recent Comments