মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের ঘোর কালো মেঘ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) এবং ইসরায়েলের (Israel) সাথে ইরানের (Iran) চলমান তীব্র সংঘাতের জেরে বর্তমানে প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz)। এই আকস্মিক অচলাবস্থার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখন আকাশছোঁয়া। বিশ্ব অর্থনীতি যখন এক বড়সড় মন্দার সম্মুখীন, ঠিক তখনই এই জলপথ পুনরায় সচল করতে এক অভিনব এবং বেশ আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। পশ্চিমা মিত্রদের চাপ দেওয়ার পাশাপাশি এবার তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে দ্বারস্থ হয়েছেন এশীয় পরাশক্তি চীনের (China)।
সম্প্রতি ফ্লোরিডা (Florida) থেকে প্রেসিডেন্ট বহনকারী বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে ওয়াশিংটন (Washington) ফেরার পথে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ট্রাম্প। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অবিলম্বে এগিয়ে আসা উচিত। ট্রাম্পের যুক্তি, আমেরিকা এই জলপথ দিয়ে খুব সামান্য পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে। তাই এটি পাহারা দেওয়ার দায় একা যুক্তরাষ্ট্রের নয়। তিনি সরাসরি বেইজিংয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আমি মনে করি, চীনেরও আমাদের সাহায্য করা উচিত। কারণ তাদের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে এই প্রণালি দিয়ে।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল সাহায্য চেয়েই ক্ষান্ত হননি, রীতিমতো প্রচ্ছন্ন এক হুঁশিয়ারি ছুঁড়ে দিয়েছেন। চলতি মাসের শেষের দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের (Xi Jinping) সাথে তাঁর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির এই সংকটজনক ইস্যুতে চীন যদি সামরিক বা কূটনৈতিকভাবে কোনো গঠনমূলক সাড়া না দেয়, তবে ট্রাম্প ওই সফর পিছিয়ে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। তাঁর পরিষ্কার বক্তব্য, যারা এই জলপথের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থেই তাদের উচিত এর নিরাপত্তায় যুদ্ধজাহাজ পাঠানো।
শুধু চীন নয়, ট্রাম্পের এই আন্তর্জাতিক নৌ-জোট গঠনের আহ্বানের তালিকায় রয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও। কিন্তু তাঁর এই প্রস্তাবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আশাব্যঞ্জক সাড়া মেলেনি। যুক্তরাজ্য (United Kingdom), জাপান (Japan), ফ্রান্স (France) এবং অস্ট্রেলিয়ার (Australia) মতো শক্তিশালী দেশগুলো ইতিমধ্যেই এই চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নিজেদের নৌবাহিনী পাঠাতে প্রবল অনীহা প্রকাশ করেছে। মিত্রদের এমন শীতল ও সতর্ক প্রতিক্রিয়ায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি ন্যাটো (NATO) জোটের সদস্যদের কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপীয় মিত্ররা যদি এই বিশ্বস্তরে প্রভাব ফেলা সংকটে ওয়াশিংটনের পাশে না দাঁড়ায়, তবে আগামী দিনে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ “অত্যন্ত খারাপ” হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের এই জোট গঠনের প্রচেষ্টা আদৌ কতটা সফল হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ, গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। উলটে তেহরান এখন মরীয়া। বিশেষ করে কম খরচের ড্রোন এবং নিখুঁত নিশানার নৌ-মাইনের সাহায্যে তারা যেকোনো মুহূর্তে ওই সরু প্রণালিতে অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজ বা বিদেশি যুদ্ধজাহাজের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলো মূলত এই চরম ঝুঁকির কারণেই সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াতে চাইছে না।


Recent Comments