২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) বিধানসভা নির্বাচনের উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই নিজেদের ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত। সদ্যই প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে রাজ্যের অন্যতম প্রধান বিরোধী শক্তি বামফ্রন্ট (Left Front)। কিন্তু এই তালিকা প্রকাশের পরেই রাজ্য রাজনীতির অন্দরমহলে শুরু হয়েছে তুমুল জল্পনা। সবচেয়ে বেশি চর্চিত হচ্ছে মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) জেলার রানিনগর (Raninagar) বিধানসভা আসনটি। কারণ, এই আসনে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি সিপিএম (CPM)। সূত্রের খবর, দলের অন্দরে যথেষ্ট চাপ থাকলেও এই আসন থেকে নিজেই প্রার্থী হতে চাইছেন দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম (Mohammad Selim)।
সেলিমের রানিনগর-প্রীতি ও নেপথ্যের সমীকরণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেলিমের এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে গত ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যান। সেই নির্বাচনে গোটা রাজ্যে বামেদের ফলাফল আশানুরূপ না হলেও, এই রানিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে তারা বেশ কিছুটা এগিয়ে ছিল। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই তিনি এই আসনে লড়াই করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক মহলে আরও কানাঘুঁষো শোনা যাচ্ছে যে, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী (Adhir Chowdhury) এবং স্থানীয় দাপুটে নেতা হুমায়ুন কবীরের (Humayun Kabir) সঙ্গে তাঁর এক গোপন বোঝাপড়া বা সুসম্পর্ক রয়েছে, যা নির্বাচনে তাঁর জয়ে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।
সিপিএমের অন্দরে সাধারণত রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কড়াকড়ি থাকে। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় (Minakshi Mukherjee) ছাড়া শীর্ষ নেতৃত্বের আর কেউ প্রার্থী হবেন না। যদিও পরে দেবলীনা হেমব্রমকে (Deblina Hembram) প্রার্থী করা হয়েছে। তবে খবর অনুযায়ী, দলের বিশেষ অনুমতি বা ছাড়পত্র জোগাড় করে সেলিম শেষ পর্যন্ত রানিনগরের ময়দানে অবতীর্ণ হতে পারেন।
টালিগঞ্জ নিয়ে জল্পনা ও সুজনের ভবিষ্যৎ শুধু রানিনগর নয়, প্রথম দফার তালিকায় কলকাতার টালিগঞ্জ (Tollygunge) আসনটিও ফাঁকা রাখা হয়েছে। যাদবপুর (Jadavpur) থেকে বর্ষীয়ান আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে (Bikash Ranjan Bhattacharya) প্রার্থী করার পর, জল্পনা ছিল যে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী (Sujan Chakraborty) হয়তো আর ভোটে লড়তে চাইবেন না। কিন্তু দলের একাংশের মতে, সুজনকে প্রার্থী করার জন্যই টালিগঞ্জ আসনটি আপাতত ফাঁকা রাখা হয়েছে।
শরিকি দ্বন্দ্ব এবং জোটের ফাটল বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু (Biman Bose) প্রথম দফায় মোট ১৯২ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে সিপিএম একাই লড়ছে ১৪০টি আসনে। এছাড়া ফরওয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) ২১টি, সিপিআই (CPI) ১৬টি, আরএসপি (RSP) ১৩টি, এবং আরসিপিআই ও মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক ১টি করে আসন পেয়েছে। তবে এই তালিকা ঘোষণার পরেই প্রকাশ্যে চলে এসেছে বামফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ শরিকি দ্বন্দ্ব।
জানা গিয়েছে, অন্তত পাঁচটি আসন নিয়ে জোটের ভেতরে একেবারেই সমঝোতা হয়নি। কোচবিহার উত্তর (Cooch Behar North), জলপাইগুড়ি সদর (Jalpaiguri Sadar), হরিশচন্দ্রপুর (Harishchandrapur) ও গলসি (Galsi)— এই চারটি আসন ফরওয়ার্ড ব্লকের ভাগে থাকলেও, সেখানে নিজেদের প্রার্থী চাপিয়ে দিয়েছে সিপিএম। এতে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় (Naren Chatterjee) বামফ্রন্ট চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন যে, এই আসনগুলোতে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ হবে এবং এর ফলে বাম ঐক্য বিঘ্নিত হচ্ছে। অন্যদিকে, নদিয়ার কালীগঞ্জ (Kaliganj) আসনে সিপিএম তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আরএসপি।
লিবারেশনের অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র বিজেপিকে (BJP) প্রধান শত্রু মনে করা সিপিআইএমএল লিবারেশন (CPIML Liberation) এবার তাদের রাজনৈতিক কৌশল কিছুটা বদল করেছে। দলের রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার (Abhijit Mazumdar) জানিয়েছেন যে, ছাব্বিশের ভোটে তাঁরা রাজ্যের শাসকদল এবং বিজেপি দুই শক্তিকেই একাসনে বসিয়ে লড়াই করবেন। বৃহত্তর বাম ঐক্য পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সিপিএমের সঙ্গে আলোচনার পর তাঁরা মোট ১০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে বাংলার রাজনৈতিক চিত্রপট বেশ রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে। শরিকি দ্বন্দ্ব মিটিয়ে বামফ্রন্ট তাদের দ্বিতীয় দফার প্রার্থী তালিকায় কী চমক দেয় এবং মহম্মদ সেলিম শেষ পর্যন্ত রানিনগরের টিকিট পান কি না, সেদিকেই এখন নজর গোটা রাজ্যের।

Recent Comments