back to top
Tuesday, April 14, 2026
Leaderboard Ad Space (728x90) - Responsive
Homeসম্পাদকীয়পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: ব্যালট বাক্সে লাশের গন্ধ ও ভোটব্যাঙ্কের দাবার ছক

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: ব্যালট বাক্সে লাশের গন্ধ ও ভোটব্যাঙ্কের দাবার ছক

চায়ের দোকানের আড্ডায়, পাড়ার মোড়ে বা খবরের কাগজের প্রথম পাতায় যখন পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ২০২৬-এর রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে, তখন উৎসবের এই আপাত-গণতান্ত্রিক আবহের ঠিক নিচেই চাপা পড়ে থাকে এক গভীর, অস্বস্তিকর সত্য। উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলোতে যেখানে রাজনৈতিক হানাহানি মূলত জাতপাত বা ধর্মের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির রসায়ন সেখানে সম্পূর্ণ আলাদা । এখানে লড়াইটা নিছকই রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের । সমাজতাত্ত্বিকরা একে বলেন “পার্টি সোসাইটি” বা দলীয় সমাজ, যেখানে নিরঙ্কুশ আনুগত্য ছাড়া টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব

এই অতি-মেরুকৃত, রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয়করণ হওয়া পরিবেশে ‘ভিকটিমহুড’ বা শিকার হওয়ার ধারণাটি আর কেবল আইনি বা সামাজিক পরিসরে আটকে নেই । বরং, তা হয়ে উঠেছে এক অত্যন্ত মূল্যবান ও সহজে লেনদেনযোগ্য রাজনৈতিক মুদ্রা (Political Currency) । যখন স্থানীয় প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থা শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনে চলে, তখন কোনো আক্রান্ত পরিবারের কাছে বিচারের আশায় রাস্তায় নেমে ব্যক্তিগত ট্রমাকে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না । কিন্তু রাজ্যের এই বিষাক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে সেই কান্না বেশিক্ষণ অরাজনৈতিক থাকে না; খুব দ্রুত তা ভোটব্যাঙ্কের সমীকরণ মেলাতে শাসকদলের বিরুদ্ধে এক মোক্ষম অস্ত্রে পরিণত হয়

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক লিলি চৌলিয়ারাকির ভাষায়, আধুনিক রাজনীতি প্রায়শই এক “পলিটিকস অফ পেইন” বা যন্ত্রণার রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে । পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বটি মর্মান্তিক মাত্রায় সত্যি। এখানে প্রশাসন যখন শাসকদলের ক্যাডারদের বাঁচাতে এফআইআর (FIR) পর্যন্ত নিতে অস্বীকার করে, তখন ভুক্তভোগীরা ‘সেকেন্ডারি ভিকটিমাইজেশন’ বা দ্বিতীয়বার নিপীড়নের শিকার হন । সরকারি তথ্যের সাথে বাস্তবের আকাশ-পাতাল ফারাক তৈরি হয়। যেমন, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী ভয়াবহ হিংসায় ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB) মাত্র ৭টি রাজনৈতিক হত্যার কথা স্বীকার করেছিল, যেখানে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩৭ জনের মধ্যে । রাষ্ট্রের এই চরম উদাসীনতাই শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের বাধ্য করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের মাইক হাতে তুলে নিতে ।

কিন্তু এই রাজনৈতিক মাইক হাতে তুলে নেওয়ার পরিণতি কি সত্যিই ক্ষমতায়ন? নাকি তা কেবলই ব্যবহারের পর ছুড়ে ফেলার এক নির্মম খেলা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে নব্বইয়ের দশকে, এক বিস্মৃত মায়ের মর্মান্তিক ইতিহাসের দিকে।

বিস্মৃতির অতলে হারানো এক অনুঘটক: ফেলানী বসাক

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে, দীর্ঘ সময়ের বামফ্রন্ট শাসনকে টলিয়ে দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র তাত্ত্বিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রয়োজন ছিল না; প্রয়োজন ছিল এক তীব্র, নাড়িয়ে দেওয়ার মতো আবেগের । আর সেই আবেগের নিখুঁত মুখ হয়ে উঠেছিলেন ফেলানী বসাক নামের এক হতভাগ্য মা।

১৯৯২ সালে নদিয়ার শান্তিপুরে ফেলানী বসাকের মূক ও বধির কন্যা দিপালী এক সিপিআই(এম) ক্যাডারের হাতে পাশবিকভাবে ধর্ষিতা হন । স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে বিচার না পেয়ে চরম অসহায়তায় এই মা দ্বারস্থ হন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের । এক অহংকারী রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে ধর্ষিতা এক প্রতিবন্ধী মেয়ে ও তাঁর মায়ের চোখের জলের যে অপরিসীম রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে, তা সেদিন খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন সেদিনের সেই লড়াকু বিরোধী নেত্রী

আরো পড়ুন:  কাঁচা পাটের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেন সুকান্ত মজুমদার

১৯৯৩ সালের ৭ জানুয়ারি, দিপালী ও ফেলানী বসাককে নিয়ে সরাসরি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে (মহাকরণ) তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দপ্তরে অভিযোগ জানাতে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল অভাবনীয় রকমের নিষ্ঠুর। বিরোধী নেত্রীকে চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে বের করে দেয় কলকাতা পুলিশ । একইসাথে ফেলানী বসাক এবং তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়েকে প্রিজন ভ্যানে তুলে লালবাজারের লক-আপে আটকে রাখা হয় এবং মাঝরাতে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় ।

কিন্তু যে মায়ের চোখের জল বিরোধীদের রাজনৈতিক জমি শক্ত করেছিল, ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানোর পর তাঁর কী পরিণতি হলো? দিপালী সাপের কামড়ে মারা যাওয়ার পর তাঁর আইনি বিচারের দাবি চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয় । দিপালীর একটি ছোট্ট কন্যাসন্তান ছিল। দিপালীর মৃত্যুর পর অনাথ আশ্রমের কর্তৃপক্ষ ফেলানীর বুক থেকে সেই নাতনিকেও কেড়ে নেয় এই যুক্তিতে যে, তিনি সন্তান পালনে আর্থিকভাবে অক্ষম

কান্নায় ভেঙে পড়ে ফেলানী আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “প্রথমে ঈশ্বর দিপালীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তারপর মমতা” । চরম দারিদ্র্য, ভগ্নস্বাস্থ্য এবং তীব্র একাকীত্বের মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই হতভাগ্য মায়ের মৃত্যু ঘটে । তাঁর এই মর্মান্তিক পরিণতি প্রমাণ করে যে, নব্বইয়ের দশকের “ক্যাটালিস্ট ফেজ” বা অনুঘটক পর্বে ভুক্তভোগীরা কেবল রাজনৈতিক আখ্যান তৈরির কাঁচামাল ছিলেন; ক্ষমতা পাওয়ার পর তাঁদের ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলতে একটুও সময় লাগেনি । সিঙ্গুরের তাপসী মালিকের পরিবারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বঞ্চনার চিত্র আমরা পরে দেখেছি ।

এক প্যারাডাইম শিফট: শোক থেকে ক্ষমতার অলিন্দে রিজওয়ানুর রহমান

সময়ের সাথে সাথে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ এই ‘ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলার’ কৌশলটি ধরে ফেলেন । প্রতীকী প্রতিবাদ আর বিচারের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে চিঁড়ে ভিজছে না দেখে রাজনৈতিক দলগুলোও বাধ্য হয় তাদের দাবার ছক পাল্টাতে । শুরু হয় “ট্রানজিশনাল ফেজ” বা উত্তরণের পর্ব, যেখানে নিহতদের পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক পুনর্বাসন বা টিকিট দেওয়ার রীতি শুরু হয়

এর সবচেয়ে বড় এবং নিখুঁত উদাহরণ ২০০৭ সালের রিজওয়ানুর রহমান মৃত্যু রহস্য । কলকাতার তিলজলার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত যুবক রিজওয়ানুর, প্রভাবশালী শিল্পপতি অশোক তোদির কন্যা প্রিয়াঙ্কা তোদিকে বিয়ে করার অপরাধে পুলিশের ক্রমাগত হুমকি ও মানসিক অত্যাচারে আত্মহননের পথ বেছে নেন । একজন আইনিভাবে বিবাহিত দম্পতিকে আলাদা করতে পুলিশের এই নগ্ন হস্তক্ষেপ গোটা কলকাতায় ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়

রিজওয়ানুরের দাদা রুকবানুর রহমান, যিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই অসম লড়াইয়ে এফআইআর (FIR) দায়ের করে পরিবারের মুখ হয়ে উঠেছিলেন, বিরোধীরা তাঁকে লুফে নেয় । কিন্তু ফেলানী বসাকের মতো তাঁকে শুধু মিছিলে হাঁটিয়ে ভুলে যাওয়া হয়নি। রুকবানুরকে সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসে অন্তর্ভুক্ত করে নদিয়ার চাপড়া কেন্দ্র থেকে বিধানসভার টিকিট দেওয়া হয় । রুকবানুর ২০১১ এবং ২০১৬ সালে চাপড়া থেকে জয়ী হন

আরো পড়ুন:  ভূমিকম্পে রঙ্গরসিকতায় কাঁপল সামাজিক মাধ্যমের দেওয়ালও

ফেলানী বসাকের সাথে রুকবানুরের এই ভাগ্য পরিবর্তনের মূল কারণ ছিল তাঁদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান বা ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ । রুকবানুর ছিলেন একজন শিক্ষিত পুরুষ, যিনি সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলতে পারতেন এবং সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের এক বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করতেন । অন্যদিকে ফেলানী ছিলেন একজন চরম দরিদ্র, অশিক্ষিত, প্রান্তিক নারী—যাঁর মিছিলে হাঁটার মতো প্রতীকী মূল্য থাকলেও, রাজনৈতিক নেতা হওয়ার কোনো রসদ ছিল না

আজ ২০২৬ সালের নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায়, রুকবানুর আর সেই শোকাহত ভাইটি নেই; তিনি আজ একজন পুরোদস্তুর, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতা । রাজনৈতিক সমীকরণ, ডেমোগ্রাফি এবং প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা সামাল দিতে দল তাঁকে এবার চাপড়া থেকে সরিয়ে পলাশীপাড়া কেন্দ্রে (প্রার্থী নং ৭৯) দাঁড় করিয়েছে । এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, শোক কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ রাজনৈতিক হিসেবে পরিণত হয়

২০২৬ সালের নিদারুণ বাস্তব: প্রাতিষ্ঠানিক শোক ও নতুন মুখের আগমন

রিজওয়ানুরের সময় যে প্রবণতা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তা তার চূড়ান্ত, নগ্ন রূপ ধারণ করেছে । শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে থাকা তীব্র প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতাকে কাজে লাগাতে বিরোধী দলগুলো এবার সরাসরি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোকে ব্যালট বাক্সে দাঁড় করিয়েছে

পাণিহাটির ময়দানে অভয়ার মা (বিজেপি): ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আর.জি. কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের (যাঁকে ‘অভয়া’ নামে ডাকা হচ্ছে) ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক বড়সড় জলবিভাজিকা । এই ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরে প্রোমোশন-দুর্নীতি এবং পুলিশের চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়তাকে মানুষের সামনে এনে দাঁড় করায় ।

দীর্ঘ আঠারো মাস ধরে বিচারের জন্য লড়াই করার পর, অভয়ার মা এখন সরাসরি বিজেপির টিকিটে উত্তর ২৪ পরগনার পাণিহাটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন । তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি হলো, “বর্তমান প্রশাসনের অধীনে পশ্চিমবঙ্গের কোনো নারী সুরক্ষিত নয়” । তিনি বিশ্বাস করেন, মেয়ে হত্যার বিচার পেতে গেলে বর্তমান ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ সরকারকে সমূলে উৎপাটিত করে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানোই একমাত্র পথ

কালীগঞ্জের গ্রামীণ লড়াইয়ে তামান্নার মা (সিপিআইএম): শহরের এই চিত্র যখন এমন, তখন গ্রামীণ বাংলায় সিপিআই(এম) অবিকল একই কৌশল অবলম্বন করেছে । ২০২৫ সালের ২৩ জুন, নদিয়ার কালীগঞ্জের মুলুন্ডি গ্রামে তৃণমূলের এক স্থানীয় উপনির্বাচন জয়ের বিজয় মিছিল থেকে ছোড়া বোমায় নিজের বাড়ির বারান্দাতেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ৯ বছরের স্কুলছাত্রী তামান্না খাতুন । অভিযোগ, সিপিআই(এম) সমর্থক পরিবার বলেই তাদের বাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়েছিল

মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিবাহিতা, অশিক্ষিত এবং নিজের চোখের সামনে সন্তানের হত্যাকারীদের ঘুরে বেড়াতে দেখে আত্মহত্যার চেষ্টা করা সেই বিপর্যস্ত মা, সাবিনা ইয়াসমিন, আজ ২০২৬ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্টের প্রার্থী । সিপিআই(এম) নেতা বিমান বসু তাঁকে “শহীদ শিশু তামান্নার মা” হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন । সাবিনা নিজে বলছেন, “আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি, আর কিছু হারানোর নেই… এবার আমি লড়ব”

আরো পড়ুন:  Assembly Election 2026: একই নামের একাধিক প্রার্থী! ইভিএমে কীভাবে চিনবেন আপনার নেতাকে?

শুধু অভয়া বা তামান্না নয়; বগটুইয়ের অগ্নিকাণ্ড, হাঁসখালির ধর্ষণ, বা ২০২১ সালে শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চারজনের মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলোও আজ একইভাবে মেরুকরণ ও ভোটব্যাঙ্কের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে । শীতলকুচি থেকে বিজেপি এবারে সাবিত্রী বর্মণকে প্রার্থী করেছে ঠিক সেই মেরুকরণের সমীকরণকে মাথায় রেখেই

এক তিক্ত সত্যের মুখোমুখি

বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হতে পারে, বিচারহীনতার এই রাজ্যে রাজনৈতিক প্রার্থীপদ হয়তো এই অসহায় পরিবারগুলোকে লড়াইয়ের এক বড় মঞ্চ দিচ্ছে । যে পুলিশ অপরাধীদের আড়াল করে, সেই পুলিশের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করার জন্য এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়তো তাদের একটু শারীরিক ও আইনি নিরাপত্তা দেয়

কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে মুদ্রার উল্টো পিঠ বড়ই নির্মম লাগে। এই রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি আদতে এক অত্যন্ত হিসেবি এবং সিনিক্যাল পদক্ষেপ—যার মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষের আবেগ বা ইমোশনকে পুঁজি করে ভোটব্যাঙ্ক মজবুত করা । যখনই কোনো ভুক্তভোগী পরিবার কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ছাতার তলায় গিয়ে দাঁড়ায়, তখন তাদের সেই সর্বজনীন, নিরপেক্ষ বিচারের দাবিটি চিরতরে খণ্ডিত হয়ে যায়

এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে অভয়ার মায়ের ক্ষেত্রে। যে ‘রিক্লেইম দ্য নাইট’ বা রাত দখলের আন্দোলন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে শুরু হয়েছিল, সেই আন্দোলনের নেত্রীরা আজ অভয়ার মায়ের বিজেপি-যোগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছেন । বিলকিস বানো, হাথরাস বা উন্নাওয়ের উদাহরণ টেনে তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, যে দলের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ধর্ষকদের আড়াল করার ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে, তাদের হাত ধরে কি সত্যিই নারী সুরক্ষার লড়াই সম্ভব? অভয়ার বাবার সেই আক্ষেপ—যে অনেকেই এই আন্দোলনকে শুধু নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছে—প্রমাণ করে এই প্রক্রিয়ার ভেতরে কতটা বিষাদ লুকিয়ে আছে

সবশেষে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভিকটিমহুডের এই ব্যবহার বা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের নিরাময় নয়; এটি চরম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার এক জ্বলন্ত উপসর্গ মাত্র । যখন সাধারণ মানুষ দেখতে পান যে পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থা কেবল শাসকদলের ইচ্ছা পূরণের মেশিনে পরিণত হয়েছে, তখন সমাজ এক মরিয়া যন্ত্রণার থিয়েটারে পর্যবসিত হয় । যতদিন না রাজ্যের এই কাঠামোগত পচন রোধ করা যাচ্ছে এবং প্রশাসনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে, ততদিন রাজনৈতিক হানাহানি লাশ তৈরি করেই চলবে । আর রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানীরা সেই লাশের গন্ধ শুঁকে নিখুঁত দাবার ছকে তাদের কখনো মিছিলে হাঁটাবেন, কখনো টিকিট দেবেন, আবার কখনো ফেলানী বসাকের মতো চরম দারিদ্র্য আর একাকীত্বের মাঝে ছুড়ে ফেলে দেবেন

কারণ ব্যালট বাক্সের এই সমীকরণে, চোখের জলের চেয়ে ভোটের দাম যে বরাবরই অনেক বেশি।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Demo Ad
Sponsored Links

Most Popular

Recent Comments