বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়া (West Asia) অঞ্চলে ক্রমাগত বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক বিশাল অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আর ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তেই ভারত (India) পেল এক বড়সড় স্বস্তির খবর। রাশিয়া (Russia) প্রস্তাব দিয়েছে যে, তারা ভারতের বাজারে অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি-র সরবরাহ আরও অনেকটাই বাড়াতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক মহলে এই পদক্ষেপকে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাশিয়ার ফার্স্ট ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার ডেনিস মান্টুরভ (Denis Manturov) নয়াদিল্লি (New Delhi) সফরে আসেন। বৃহস্পতিবার তার এই সফরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জানা গিয়েছে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল (Ajit Doval) এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S. Jaishankar)-এর সঙ্গে তার বৈঠকে জ্বালানি ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman) এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)-র সঙ্গেও একান্ত সাক্ষাৎ করেন। রাশিয়ার সরকারি বিবৃতি থেকে জানা গিয়েছে, ডেনিস মান্টুরভ ভারতীয় নেতৃত্বকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তাদের দেশের জ্বালানি সংস্থাগুলির ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল এবং গ্যাস সরবরাহ করার পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে।
কিন্তু হঠাৎ কেন এই তেল সরবরাহের বিষয়টি এতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল?
এর প্রধান কারণ হলো ইরান (Iran)। তারা কার্যত হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)-র পণ্য চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। এটি পারস্য উপসাগর (Persian Gulf) এবং ওমান উপসাগর (Gulf of Oman)-এর মধ্যে অবস্থিত এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সরু সামুদ্রিক পথ, যার মধ্যে দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং গ্যাস সরবরাহ হয়ে থাকে। এই জলপথ অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে। যেহেতু ভারত তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির একটি বিশাল অংশের জন্য পশ্চিম এশিয়ার ওপর নির্ভরশীল, তাই এই পরিস্থিতি আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আমেরিকা (U.S.) ও ইজরায়েল (Israel)-এর সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি গোটা বিশ্বের মাথাব্যথা বাড়িয়েছে। তবে এই সংঘাতের আগে থেকেই ভারত নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে রাশিয়ান তেলের ওপর নির্ভরতা বজায় রেখেছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ভারত ওই মাসে রাশিয়া থেকে প্রায় ১.৯৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছিল। যদিও সেই সময়ে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার ভাগ কমে দাঁড়িয়েছিল ১৯.৩ শতাংশে, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন। তবে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত আবারও রাশিয়ান তেলের কেনাকাটা বাড়াতে শুরু করেছে।
গত বৃহস্পতিবার ভারত-রাশিয়া ইন্টার-গভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক, টেকনোলজিক্যাল অ্যান্ড কালচারাল কোঅপারেশন-এর বিশেষ বৈঠক বসে। এই বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন ডেনিস মান্টুরভ এবং এস জয়শঙ্কর। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, সার, সংযোগ এবং পরমাণু শক্তির মতো বিভিন্ন বিষয়ে একেবারে খোলাখুলি আলোচনা হয়। মান্টুরভ জানান যে, ২০২৫ সালের শেষের মধ্যে রাশিয়া ভারতকে সার সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও ভারতের কৃষিক্ষেত্রের চাহিদা মেটাতে তারা প্রস্তুত।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ডিসেম্বরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) ২৩তম বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসেছিলেন। সেই সময় নরেন্দ্র মোদী এবং তার মধ্যে একাধিক বিষয়ে ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পাঁচ বছরের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমান এই তেল, সার ও গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি সফল প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।


Recent Comments