পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার বিধানসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, রাজনৈতিক উত্তাপ ততই চরম আকার ধারণ করছে। আর এই রাজনৈতিক হিংসার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে উত্তর ২৪ পরগনার (North 24 Parganas) অন্যতম স্পর্শকাতর এলাকা ভাটপাড়া। নির্বাচনের আগে সেখানে গভীর রাতে চলল ব্যাপক বোমাবাজি ও গুলি। এই অপ্রত্যাশিত হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এক সিআইএসএফ (CISF) জওয়ান, যা গোটা রাজ্যে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
জানা গিয়েছে, আক্রান্ত ওই জওয়ানের নাম যোগেশ শর্মা। তিনি এলাকার দাপুটে নেতা অর্জুন সিংয়ের (Arjun Singh) ছেলে তথা ভাটপাড়ার বিজেপি (BJP) প্রার্থী পবন সিংয়ের (Pawan Singh) নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে মোতায়েন ছিলেন। রবিবার মাঝরাতে পবনের বাড়ির সামনে আচমকাই দুষ্কৃতীরা হামলা চালায়। মুহুর্মুহু বোমার আওয়াজে কেঁপে ওঠে চারপাশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তারক্ষীরা এগিয়ে এলে এক রাউন্ড গুলি চলে এবং তা সরাসরি যোগেশের পায়ে লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই কড়া অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (Election Commission) এবং তারা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে।
কিন্তু কীভাবে শুরু হলো এই ধুন্ধুমার কাণ্ড? নিউজস্কোপ বাংলার নিজস্ব অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, রবিবার সন্ধ্যায় জগদ্দল এলাকার আটচালা বাগানে দলীয় পতাকা ও ব্যানার লাগাচ্ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) এক সক্রিয় কর্মী বিট্টু মাহাতো (Bittu Mahato)। অভিযোগ, সেই সময় প্রতিপক্ষ দলের কিছু কর্মী-সমর্থক এসে তাঁকে বাধা দেয় এবং ব্যাপক মারধর করে। এরপর রাতেই জগদ্দল থানায় অভিযোগ দায়ের করতে যান আক্রান্ত ওই দলীয় কর্মী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় তৃণমূল নেতা সৌরভ সিং (Sourav Singh), গোপাল রাউত (Gopal Raut), দেবজ্যোতি ঘোষ (Debjyoti Ghosh) সহ আরও অনেকে।
থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়ার খবর পেয়েই দলবল নিয়ে সেখানে হাজির হন অর্জুন। মুহূর্তের মধ্যেই থানার সামনে দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে তুমুল বচসা শুরু হয়। কথা কাটাকাটি থেকে শুরু করে ধাক্কাধাক্কি এবং শেষপর্যন্ত তা হাতাহাতি ও ইটবৃষ্টির আকার ধারণ করে। ঘাসফুল শিবিরের অভিযোগ, তারা থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে অর্জুন সেখানে গিয়ে চরম দাদাগিরি শুরু করেন এবং তাদের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালান। পুলিশের সামনেই এই ধরনের ঘটনা ঘটায় এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। তবে গেরুয়া শিবির এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। উলটে তাদের দাবি, থানায় গেলে তাদের দলের কর্মীদের ওপরই শাসক দলের লোকজন চড়াও হয়েছিল।
থানার সামনের পরিস্থিতি পুলিশ কোনোক্রমে নিয়ন্ত্রণে আনলেও, আসল বিপত্তি ঘটে গভীর রাতে। রাতের অন্ধকারে অর্জুন-পুত্রের বাসভবনের সামনে গিয়ে বোমাবাজি শুরু করে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গুলির শব্দও শোনা যায় স্পষ্ট। আর সেই আঘাতেই লুটিয়ে পড়েন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জওয়ান। ঘটনার পর থেকেই গোটা এলাকা কার্যত পুলিশি ঘেরাটোপে পরিণত হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশবাহিনী।
পদ্ম শিবিরের পক্ষ থেকে সরাসরি শাসক দলের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক জমি হারাতে বসে তৃণমূল এখন সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। যদিও শাসক শিবির এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পালটা দাবি করেছে, এই বোমাবাজি ও গুলির ঘটনার নেপথ্যে প্রতিপক্ষের অন্তর্দ্বন্দ্বই দায়ী। তবে কে বা কারা আসল দোষী, তা এখনও পুলিশের কাছে পরিষ্কার নয়।
ভাটপাড়ার রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই এলাকা বরাবরই রাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্য খবরের শিরোনামে থেকেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় এলে এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। এবার খোদ কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানের ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে দুষ্কৃতীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ভোটের দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এখন কমিশনের কাছে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। ভাটপাড়ার বাতাসে এখন শুধুই বারুদের গন্ধ আর সাধারণ মানুষের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। প্রশাসন শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানালেও, রাজনৈতিক দলগুলোর রেষারেষি থামার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। এই পরিস্থিতিতে জখম জওয়ান যোগেশের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে। তবে আগামী দিনে প্রশাসন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের কতটা দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Recent Comments