নিজস্ব সংবাদদাতা: বৃহস্পতিবার সকালেই কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে তৈরি হয় এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক-আইনি দৃশ্য। আইনজীবীদের কালো কোট ও ব্যান্ড পরে আদালতে হাজির হন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ভোট-পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ মামলায় তিনি নিজেই সওয়াল করেন, যা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে।
সকাল ১০টার কিছু পরেই হাইকোর্টের মূল ফটক দিয়ে আদালত চত্বরে প্রবেশ করেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল নেতা কল্যাণ ব্যানার্জি এবং রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে।
জানা গিয়েছে, ভোট-পরবর্তী অশান্তি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও হামলার অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। সেই মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত শুনানির অনুমতিও দেয় আদালত। সেই শুনানিতেই সরাসরি অংশ নিয়ে নিজেই সওয়াল করার সিদ্ধান্ত নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, “আমি ১৯৮৫ সাল থেকে আইনজীবী। বার কাউন্সিলে আমার নাম নথিভুক্ত রয়েছে এবং নিয়ম মেনে সদস্যপদ নবীকরণ করা হয়েছে।” এই বক্তব্য ঘিরে আইন ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার ঝড় ওঠে।
সওয়াল করতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘু ও তফসিলি জাতির মানুষদের ভয় দেখানো হচ্ছে, বহু পরিবারকে ঘরছাড়া করা হচ্ছে। এমনকি ৯২ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সদ্য বিবাহিত তরুণী— কাউকেই রেহাই দেওয়া হচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।
মমতার আরও অভিযোগ, অনলাইনে অভিযোগ জানানো হলেও প্রশাসনের তরফে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাঁকেও নাকি অভিযোগ জানাতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে আদালতে জানান তিনি।
এদিন সবচেয়ে বেশি চর্চিত হয় তাঁর কড়া মন্তব্য— “এটা বাংলা, উত্তরপ্রদেশ নয়। বাংলাকে বাঁচাতে হবে।” তিলজলার অগ্নিকাণ্ডের পর শহরে বেআইনি নির্মাণ ভাঙার নামে যে বুলডোজার অভিযান চলছে, তা নিয়েও সরব হন তিনি। স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এটা বুলডোজার রাজ্য নয়।”
অন্যদিকে, আদালতে তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে খেজুরি, ডোমজুড়সহ একাধিক এলাকায় দলের পার্টি অফিস, দোকান ও কর্মীদের বাড়িতে হামলা হয়েছে। প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০টি তৃণমূল কার্যালয়ে আগুন লাগানো হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী হগ মার্কেট এলাকাতেও বুলডোজার ব্যবহারের প্রসঙ্গ আদালতে আনা হয়।
পাল্টা অভিযোগও উঠে আসে বিরোধী শিবির থেকে। তাদের দাবি, ভোটের ফল ঘোষণার পর একাধিক বিজেপি কর্মী-সমর্থক আক্রান্ত হয়েছেন এবং দুইজনের মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল পক্ষ আদালতের কাছে আবেদন জানায়, আদালতের অনুমতি ছাড়া রাজ্যে কোথাও যেন বুলডোজার ব্যবহার করে বাড়িঘর ভাঙা না হয়। পাশাপাশি ভোট-পরবর্তী হিংসা রুখতে আদালতের হস্তক্ষেপও চাওয়া হয়।
সব মিলিয়ে এদিনের কলকাতা হাইকোর্ট কার্যত রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আইনজীবীর ভূমিকায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি এবং আদালতে তাঁর সওয়াল রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আদালতের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশের দিকেই এখন নজর গোটা রাজ্যের।

Recent Comments