অশোক সেনগুপ্ত
ক্লাব-উন্নয়ন ও দুর্গাপুজোয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুদান নিয়ে বিতর্ক ও বিরোধিতা হয়েছে নানা সময়। পালাবদলের পর এ ব্যাপারে মোগলমারি বুদ্ধিস্ট এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল অতনু প্রধানের সাক্ষাৎকার।
১) অনেকের দাবি, ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতার নামে মাননীয়া মাস্তান পুষতেন। দাবিটা আদৌ ঠিক? পক্ষে যুক্তি কী?
উত্তর— বাংলার ক্লাব সংস্কৃতি একসময় ছিল সমাজসেবা, ক্রীড়া, সাহিত্যচর্চা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত এক দশকে বহু ক্ষেত্রে সেই ক্লাব সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক দখলদারি ও ভয় দেখানোর যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। সরকারি অনুদানের নামে কোটি কোটি টাকা ঢালা হলেও তার প্রকৃত হিসাব সাধারণ মানুষ কখনও জানতে পারেননি। বাস্তবে বহু জায়গায় দেখা গেছে, যেসব ক্লাব রাজনৈতিক আনুগত্য দেখিয়েছে, তারাই প্রশাসনিক সুবিধা, আর্থিক সুযোগ ও প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ যুবকদের সমাজসেবার পথে না ঠেলে, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের “দলের ছত্রছায়া”র সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে। ফলে ক্লাবের আড়ালে এক ধরনের স্থানীয় দাদাগিরি, তোলাবাজি ও ভয় প্রদর্শনের রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়েছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো— জনগণের করের টাকা ব্যবহার করে এমন এক শ্রেণি তৈরি করা হয়েছে, যারা সমাজগঠনের পরিবর্তে রাজনৈতিক ক্ষমতার পাহারাদার হয়ে উঠেছিল। অবশ্যই সব ক্লাব নয়; এখনও বহু ক্লাব নিষ্ঠার সঙ্গে মানবিক কাজ করছে, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু রাজনৈতিক মদতের অপসংস্কৃতি বাংলার সুস্থ ক্লাব ঐতিহ্যকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে— এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
২) অনেকে মনে করেন, মাননীয়া ভেবেছিলেন, এতে প্রতিটি পাড়ার ছেলে আমার বশংবদ থাকবে। ধারণাটা কি ঠিক?
উত্তর— এই ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে অনুদান, সুবিধা ও সরকারি সহায়তাকে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে জুড়ে দেওয়া হয় । যুবসমাজকে কর্মসংস্থান, শিল্প, গবেষণা, প্রযুক্তি কিংবা শিক্ষার মাধ্যমে শক্তিশালী করার পরিবর্তে তাদের একাংশকে “অনুদাননির্ভর” সংস্কৃতির মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে আত্মনির্ভর যুবকের বদলে তৈরি হয়েছে সুবিধাভোগী রাজনৈতিক অনুসারীর মানসিকতা। বাংলার যুবসমাজ একসময় চিন্তা, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও বিপ্লবের পথ দেখাত। অথচ আজ বহু পাড়ায় ক্লাব মানেই রাজনৈতিক পতাকার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের কেন্দ্র— এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা। যে সরকার যুবকদের হাতে বই, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের চাবিকাঠি তুলে দেওয়ার বদলে অনুদানের রাজনীতি শেখায়, তারা আসলে স্বাধীন চিন্তার যুবসমাজ চায় না; তারা চায় নিয়ন্ত্রিত আনুগত্য।
৩) বিজেপি-র কি পুজো-অনুদান প্রত্যাহার করে সেই অর্থ উন্নয়নমূলক কাজে লাগানো উচিত?
উত্তর— অবশ্যই উচিত। কারণ সরকারের কাজ উৎসবের স্পনসর হওয়া নয়; সরকারের কাজ মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা। যে রাজ্যে হাসপাতালের বেড কম, বহু স্কুলে শিক্ষক নেই, গবেষণার পরিকাঠামো দুর্বল, শিল্প নেই, কর্মসংস্থান নেই— সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা অনুদানের নামে খরচ করা এক ধরনের রাজনৈতিক অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। সংস্কৃতি কখনও সরকারি টাকার ভিক্ষায় বাঁচে না। বাঙালির উৎসব তার আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক সংহতির শক্তিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে আছে। সেই অর্থ যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, গ্রামীণ উন্নয়ন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ কিংবা ক্রীড়া অবকাঠামোয় ব্যয় করা হয়, তাহলে রাজ্যের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। আজ বাংলার বহু মেধাবী ছাত্র অর্থের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে, বহু রোগী চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে— সেখানে পুজো অনুদানকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার বানানো অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকার যদি সত্যিই মানুষের সরকার হতে চায়, তাহলে অনুদানের রাজনীতি বন্ধ করে উন্নয়নের রাজনীতি শুরু করতে হবে।
৪) রাজনৈতিক এই পালাবদলে কি পুজো উদ্যোক্তারা কিছু ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন? হ্যাঁ হলে, ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে, কেন?
উত্তর— সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং পরম্পরা রক্ষায় বাঙালি কখনোই কাউকে অনুকরণ করে না। তবে যেসব ক্লাব বছরের পর বছর সরকারি অর্থ ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ার ওপর নির্ভর করে চলেছে, তাদের একটা অংশ প্রথমদিকে সমস্যায় পড়তেই পারে। কারণ অনেকের সাংগঠনিক ভিত্তি নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিল মূল শক্তি। কিছু ক্লাব হয়তো বুঝতে পারবে যে, জনসমর্থনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের ওপরই তারা বেশি নির্ভরশীল ছিল।তবে এটাও সত্য, বাংলার মানুষ কোনওদিন সরকারি অনুদানের অপেক্ষায় বসে থেকে উৎসব করেনি। সাধারণ মানুষ চাঁদা তুলে, শ্রম দিয়ে, আবেগ দিয়ে যুগ যুগ ধরে উৎসবকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই প্রকৃত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্লাবগুলির ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং রাজনৈতিক দখলদারি কমলে ক্লাব সংস্কৃতি আবার সমাজসেবা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রকৃত কেন্দ্রে ফিরে আসতে পারবে।
বাংলা উৎসবপ্রেমী, কিন্তু বাংলা আত্মসম্মানীও। তাই মানুষ অনুদানের রাজনীতি নয়— মর্যাদার সংস্কৃতি চায়।
(ছবি সৌজন্যে অভির ছবিঘর)।


Recent Comments