রাজ্যে বেসরকারি পরিবহণ ব্যবস্থা বর্তমানে এক গভীর সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলেও, গত আট বছরের বেশি সময় ধরে বাসের ভাড়া বাড়েনি। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে রাজ্যের বেসরকারি বাস মালিকরা এবার আশার আলো দেখছেন প্রাক্তন পরিবহণ মন্ত্রী তথা বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র মধ্যে। আগামী দিনে তাঁকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন বাস মালিকেরা, এমনটাই এক আবেগঘন বার্তায় জানালেন জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেটস (Joint Council of Bus Syndicates)-এর সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় (Tapan Banerjee)।
২০১৬ সালের ২৭শে মে রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন শুভেন্দু বাবু। সেই সময় থেকেই তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সাক্ষী থেকেছেন তপন বাবু। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, শপথ নেওয়ার ঠিক পরের দিনই তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন নতুন মন্ত্রী। রাজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ যে বেসরকারি পরিবহণের উপর নির্ভরশীল, সে কথা ভালোমতোই জানতেন তিনি। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে তিনি অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং যেকোনো সমস্যার কথা উঠলেই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন।তপন বাবু জানান, শুভেন্দু অধিকারীর কার্যকালে একাধিক তাৎক্ষণিক এবং যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একবার মুর্শিদাবাদ (Murshidabad)-এ গঙ্গার জলে একটি বেসরকারি বাস পড়ে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। সেই সময় ওই জেলাতেই ছিলেন মন্ত্রী। তড়িঘড়ি কলকাতা (Kolkata)-র উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার সময় তিনি ফোনে তপন বাবুর সাথে কথা বলেন। সেই ফোনালাপেই তপন বাবু প্রস্তাব দিয়েছিলেন, গাড়ি চালানোর সময় চালকদের মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা উচিত। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবহণ দফতর থেকে এই বিষয়ে কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয়।
এছাড়াও টালা ব্রিজ ভাঙার সময় উত্তর কলকাতা ও বিটি রোডে যখন তীব্র যানজট ও সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি শুরু হয়, তখন রাতের বেলায় হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কিছু প্রস্তাব মন্ত্রীকে পাঠিয়েছিলেন তপন বাবু। পরের দিন সকালে ভরা বৈঠকে সেই প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করেন মন্ত্রী এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান করেন। প্রশাসনিক স্তরেও তাঁর কড়া নজর ছিল। একবার বর্ধমান (Burdwan)-এ একটি বাস দুর্ঘটনার পর পুলিশ বাসটি ছাড়ার জন্য মালিকপক্ষের কাছে বিপুল টাকা দাবি করে। খবর পেয়ে পরের দিন সকালেই সেখানে প্রশাসনিক ভবনে পৌঁছে যান মন্ত্রী এবং সরাসরি পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়ে বাসটি ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন। মালদহ (Malda)-তেও এমনই এক সমস্যার দ্রুত সমাধান করেছিলেন তিনি।তবে শুধুমাত্র কড়া প্রশাসক হিসেবেই নয়, তাঁর মানবিক দিকটিও সকলের নজর কেড়েছিল। একবার একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে তপন বাবুর সঙ্গে এক হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি মন্ত্রীর দফতরে গিয়েছিলেন।
তা দেখে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আগে জানলে তিনি নিজেই নিচে নেমে আসতেন।এত সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, বেসরকারি পরিবহণের স্বার্থে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে পথে নামতেও পিছপা হননি তপন বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৮ সালে যখন জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া, অথচ বাসের ভাড়া বাড়ছিল না, তখন তিনি ‘ধীরে চলো বাস’ এবং খালি গায়ে মহামিছিলের ডাক দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ করে এবং বহু বাস মালিককে গ্রেফতার করে লালবাজারে নিয়ে যায়।
পরে এই বিষয়ে মন্ত্রী তলব করলে, তপন বাবু স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে এই প্রতিবাদ মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে। তিনি নিজেকে একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবেই তুলে ধরেছিলেন, যার প্রধান লক্ষ্য বেসরকারি পরিবহণকে বাঁচানো। সেই বছরই, অর্থাৎ ২০১৮ সালে, শুভেন্দু বাবুর হাত ধরেই রাজ্যে শেষবার বাস ও মিনিবাসের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছিল। এরপর গত আট বছরে আর কোনো পরিবর্তন হয়নি।


Recent Comments