রাজ্যের রাজনীতিতে একের পর এক নাটকীয় মোড়। লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচন মিটে গেলেও রাজনৈতিক উত্তাপ কমার কোনও লক্ষণ নেই ভারত (India)-এর অন্যতম চর্চিত রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এ। প্রতিদিন নিত্যনতুন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে সরগরম হয়ে রয়েছে রাজ্য রাজনীতি। এবার খবরের শিরোনামে উঠে এলেন শাসক দলের এক অতি পরিচিত এবং দাপুটে নেতা। জানা গিয়েছে, আলিপুর (Alipore) আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) দলের বর্ষীয়ান নেতা এবং দাপুটে বিধায়ক জাভেদ খান (Javed Khan)।
কিন্তু হঠাৎ কেন তাঁকে আচমকা আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হল? কী এমন ঘটেছিল যার জন্য খোদ শাসক দলের একজন হেভিওয়েট বিধায়ককে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হল? এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই কলকাতা (Kolkata)-র রাজনৈতিক মহলে জোর চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন জেগেছে যে, একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এমন কী অভিযোগ উঠল যার কারণে তাঁকে তড়িঘড়ি জামিন নিতে হচ্ছে।
তিলজলাকাণ্ড এবং বিধায়কের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ
আদালত এবং স্থানীয় পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কয়েকদিন আগে শহরের বুকে তিলজলা (Tiljala) এলাকায় একটি বড়সড় অশান্তি এবং মারামারির ঘটনা ঘটেছিল। সেই রাজনৈতিক হিংসা এবং ব্যাপক গোলমালের ঘটনায় সরাসরি নাম জড়ায় এই তৃণমূল বিধায়কের। অভিযোগ ওঠে যে, তাঁর প্রত্যক্ষ মদত এবং প্ররোচনাতেই নাকি ওই এলাকায় চূড়ান্ত উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিজেপি (BJP)-র পক্ষ থেকে জোর গলায় অভিযোগ করা হয়েছিল যে, শাসক দলের এই হেভিওয়েট নেতা নিজের দাপট এবং ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।
পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে এই ঘটনায় একটি এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে। সেই তিলজলায় অশান্তি ছড়ানোর মামলাতেই এবার আলিপুর কোর্টে সশরীরে হাজিরা দিয়ে আত্মসমর্পণ করলেন কসবা (Kasba)-র এই তৃণমূল বিধায়ক। আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুলিশি পদক্ষেপ, হঠাৎ তলব বা সম্ভাব্য গ্রেফতারি এড়াতেই তিনি তাঁর আইনজীবীদের পরামর্শে নিজে থেকে আদালতে আত্মসমর্পণ করে আগাম জামিনের আবেদন জানিয়েছেন। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে যে সমস্ত জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের হয়েছিল, তার ভিত্তিতে পুলিশ যে কোনও সময় কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারত।
পরপর শীর্ষ নেতাদের আত্মসমর্পণ, অস্বস্তিতে কি শাসক দল?
বিধায়ক জাভেদ খানের এই আইনি পদক্ষেপ কিন্তু একেবারে বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ঠিক এর একদিন আগেই একই আদালতে আত্মসমর্পণ করতে দেখা গিয়েছিল কলকাতা দক্ষিণের হেভিওয়েট তৃণমূল সাংসদ মালা রায় (Mala Roy)-কে। রাজ্যে নির্বাচনের ফল ঘোষণার ঠিক পরপরই বিরোধী দলের কর্মীদের অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখানোর এক গুরুতর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধেও পুলিশ মামলা রুজু করেছিল। সেই অস্ত্র আইনের মামলাতেই নিজের ছেলে নির্বাণ রায়কে সঙ্গে নিয়ে তিনি আলিপুর কোর্টে আত্মসমর্পণ করেন এবং শেষমেশ আদালত থেকে জামিন পান।
রাজ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শাসক দলের একজন শীর্ষ সাংসদ এবং একজন দাপুটে বিধায়কের এইভাবে আদালতে আত্মসমর্পণ করার ঘটনাটি সত্যিই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই আইনি ইস্যুগুলিকে নিজেদের পালে হাওয়া টানার জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে জোরকদমে ময়দানে নেমে পড়েছে। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, রাজ্যের শাসক দলের নেতা ও মন্ত্রীরা যে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বেআইনি কাজকর্ম এবং সন্ত্রাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, আদালতের এই চাঞ্চল্যকর মামলাগুলিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যদিও শাসক দল তথা তৃণমূল নেতৃত্বের তরফ থেকে বারবার পাল্টা দাবি করা হচ্ছে যে, এগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মিথ্যা মামলা। তাঁদের জনপ্রিয় নেতাদের কালিমালিপ্ত করা এবং ফাঁসানোর জন্যই বিরোধীরা চক্রান্ত করে এই ধরনের অভিযোগ দায়ের করছে।
আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আইনি লড়াই
জাভেদ খানের এই আত্মসমর্পণ এবং তার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ এখন ঠিক কোন দিকে মোড় নেয়, আপাতত সেদিকেই কৌতূহলী দৃষ্টি সকলের। একজন অভিজ্ঞ জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর নিজের এলাকায় যথেষ্ট দাপট ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তিলজলা, কসবা থেকে শুরু করে সংলগ্ন অঞ্চলে তাঁর সক্রিয় অনুগামীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাই এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রভাব আগামী দিনে দলের নিচুতলার সাধারণ কর্মীদের মনোবলের ওপর কতটা গিয়ে পড়ে, তার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।


Recent Comments