নিভে গেল আরও একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। গোটা বাংলা চলচ্চিত্র জগতকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন প্রখ্যাত পরিচালক অনীক দত্ত (Anik Dutta)। শুক্রবার তাঁর শেষ যাত্রার সাক্ষী থাকল কলকাতা (Kolkata)। জীবনের শেষ বেলায় এই কিংবদন্তি পরিচালকের নিথর দেহ এসে পৌঁছায় রাজ্যের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক পীঠস্থান নন্দনে (Nandan)। সেখানেই তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সকাল থেকে ঢল নেমেছিল অগণিত অনুরাগী এবং টলিউড (Tollywood) ইন্ডাস্ট্রির বিশিষ্টজনেদের। ফুলে ফুলে সুসজ্জিত কাচের শবাধারটি যখন নন্দন চত্বরে এসে পৌঁছায়, তখন উপস্থিত সকলের চোখে ছিল জল। শোকের এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে ‘অপরাজিত’ পরিচালকের এই অন্তিম যাত্রা যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের নানা অমূল্য অধ্যায়কে।
এইদিন নন্দন চত্বরে প্রয়াত পরিচালককে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিনোদন এবং রাজনীতির জগতের বহু চেনা মুখ। তাঁদের মধ্যেই অন্যতম ছিলেন লকেট চট্টোপাধ্যায় (Locket Chatterjee)। পরিচালকের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দৃশ্যতই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। রজনীগন্ধার স্তবক দিয়ে শেষবারের মতো সম্মান জানানোর পর সংবাদমাধ্যমের, বিশেষ করে আমাদের নিউজস্কোপ বাংলার (Newscope Bangla) প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হয়ে তিনি তাঁর গভীর শোক প্রকাশ করেন। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত এবং বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে লকেট বলেন, “ওঁর এই অকাল প্রয়াণ সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের যে কতটা অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, তা আজ হয়তো আমরা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছি না। ওঁর শূন্যস্থান কেউ কখনও পূরণ করতে পারবেন না।”
অনীক শুধুমাত্র একজন সফল পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্পষ্টবক্তা এবং আপাদমস্তক নির্ভীক মানুষ। তাঁর এই গুণের কথাও বিশেষভাবে স্মরণ করেন লকেট। তিনি জানান যে, নিজের শর্তে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে সত্যিই বিরল। কোনওদিন কোনও অন্যায়ের সঙ্গে তিনি আপস করেননি, আর সেই প্রতিচ্ছবি বারবার ধরা পড়েছে তাঁর তৈরি প্রতিটি সিনেমাতেও। তাঁর এই স্বাধীনচেতা মনোভাবই তাঁকে সাধারণ মানুষের আরও কাছের করে তুলেছিল। লকেটের কথায় বারবার উঠে এসেছে সেই আক্ষেপের সুর, যে এমন একজন শিরদাঁড়া সোজা রাখা মানুষের চলে যাওয়া আসলে গোটা সমাজেরই এক অপূরণীয় ক্ষতি।
বাংলা সিনেমায় যখন গতে বাঁধা গল্পের ছড়াছড়ি, তখন একেবারে নতুন ধরনের এক হাওয়া নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তাঁর পরিচালিত ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ বাঙালি দর্শকদের কাছে ইতিমধ্যেই এক কাল্ট ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। হাসির মোড়কে সমাজের নানা অসঙ্গতি, রাজনৈতিক ভণ্ডামি এবং কর্পোরেট আগ্রাসনকে যেভাবে তিনি বড় পর্দায় তুলে ধরেছিলেন, তা আজও সিনেমাপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে। এরপর ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ কিংবা তাঁর সাম্প্রতিকতম সৃষ্টি ‘অপরাজিত’—প্রতিটি ছবিতেই তিনি প্রমাণ করেছেন নিজের অসামান্য বুদ্ধিমত্তা এবং ব্যঙ্গাত্মক শৈল্পিক বোধের। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি তৈরির নেপথ্য কাহিনি নিয়ে তৈরি ‘অপরাজিত’ তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) থেকে শুরু করে সমগ্র ভারত (India) এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও এক আলাদা পরিচিতি ও সম্মান এনে দিয়েছিল।
বাঙালি দর্শকের রুচি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। একটা সময় যখন মনে করা হচ্ছিল যে ভালো কনটেন্টের অভাবে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলা ছবি, ঠিক তখনই তাঁর মতো পরিচালকেরা হাল ধরেছিলেন এবং দর্শকদের পুনরায় হলমুখী করেছিলেন। তাঁর ছবির সংলাপগুলি এতটাই তীক্ষ্ণ এবং বুদ্ধিদীপ্ত ছিল যে, দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়েও তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতেন। তাঁর মতো একজন চিন্তাশীল ও প্রগতিশীল মানুষের চলে যাওয়া মানে শুধুমাত্র একজন দক্ষ পরিচালকের মৃত্যু নয়, বরং একটা মুক্ত চিন্তার শক্তিশালী কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া।
নন্দন চত্বরে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করছিল যে তিনি শুধু পুরস্কার বা সমালোচকদের প্রশংসাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন আপামর বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায়। দূরদূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছিলেন শুধু তাঁকে শেষবার চোখের দেখা দেখার জন্য। গোটা এলাকা জুড়ে বিরাজ করছিল এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ। দীর্ঘ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন পর্বের পর যখন তাঁর দেহ শেষকৃত্যের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন বাংলার শিল্পজগতে একটা আস্ত যুগের যেন অবসান ঘটল।


Recent Comments