অশোক সেনগুপ্ত

বাঁচতে গেলে, বিশ্বকে বাঁচাতে গেলে অনেক কিছুর সঙ্গে বদলাতে হবে আমাদের খাদ্যাভাস। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভাস মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পরিহারের চেষ্টা করতে হবে প্রাণীর মাংস খাওয়া। বন্ধ করতে হবে অপচয়। ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’-এর ১৩৪-তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিবসের ভাষণে শনিবার এই দিশা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শদাতা সুব্রত গুপ্ত। এ ব্যাপারে সামগ্রিক সচেতনতা তৈরি করতে না পারলে পায়ে পায়ে শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিন এগিয়ে আসতে পারে।

সুব্রতবাবুর বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘আগামী বিশ্বের খাদ্যসংকট’। যুক্তি, তথ্য ও বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ-সহ তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, আমরা যেভাবে বিভিন্ন, বিশেষ করে প্রাণীর মাংসভক্ষন করি, তাতে কী ধরণের সংকট দেখা দিতে পারে। আলোকপাত করেন এর সম্ভাব্য নানা সমাধানসূত্রের ওপরেও। পুষ্টির লক্ষ্যে আমরা প্রথাগত যে খাদ্যাভাসের মধ্যে আছি, তার আবশ্যিক বদলের (ডায়েটরি চেঞ্জ) অপরিহার্যতার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবাসীকে তো বলতে পারিনা, মাংস খেওনা! কিন্তু কেন, ঠিক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রসঙ্গটা তুলছি, সেটা অনুভব করতে হবে। যে ক্যালোরি আমাদের দরকার, বিশ্বে তার ১৮ শতাংশ আসে প্রাণীমাংস থেকে। বাকি ক্যালোরি যোগান দেয় চাষযোগ্য নানা শষ্য, বা ফসল। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ১২ রকমের শষ্য এবং ৫ রকমের প্রাণীর ওপর আমরা নির্ভরশীল।

এই ঘটাপেটায় কৃষির তথাকথিত উন্নতির মাঝে নির্দিষ্ট সময়সীমায় লাইভস্টকের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। কিন্তু প্রায় ২৮ হাজার প্রজাতির ফলন অবলুপ্তির পথে। এর প্রায় ২৪ হাজার অবলুপ্তির আশঙ্কার জন্য দায়ী কৃষির নানা কারণ। বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সুব্রতবাবু ‘ফিড কনভারশন রেশিও’-র তত্ত্বের উল্লেখ করে বলেন, ১৯৬১ থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বে মাংসের উৎপাদন চার গুণ বেড়েছে। কিন্তু প্রতিটি প্রাণীর পেশী তৈরির জন্য যতটা খাদ্য ও জল লাগছে, তার বিনিময়ে মাংস হচ্ছে অনেক কম। বিভিন্ন ধরণের প্রাণীর কত খাবার লাগে এবং আমরা সেগুলোর দেহ থেকে কতটা পাই, তার নমুনা দিয়ে তিনি বলেন, একটা গরুকে ১৫ কিলো খাবার দিলে তার ওজনবৃদ্ধি হয় ১ কিলো। একটা মুর্গীকে ৩.৩ কিলো খাবার দিলে তার ওজনবৃদ্ধি হয় ১ কিলো। সেদিক থেকে লাভ হয় দুধে। সাধারণ হিসাবে গরুকে ৭০০ গ্রাম খাবার দিলে ১ কিলো দুধ আমরা পেতে পারি।

প্রাণীকূলের খাবার উৎপাদনের জন্য যে আয়তনের জমি দরকার, সেটাও যথেষ্ঠ বিবেচ্য। এ কথা জানিয়ে সুব্রতবাবু তাঁর ভাষণে বলেন, ৮.৪৯ বর্গমিটারে অংশে আমরা হয়তো গড়ে এক কিলো মাছ পেতে পারি, এক কিলো শূকরের মাংসের জন্য ১৭.৪ বর্গমিটারে অংশ, কিলোপিছু হাঁস-মুর্গির (পোলট্রির) জন্য সেখানে আমাদের দরকার ১২.২ বর্গমিটার জায়গা, কিলোপিছু দুধের জন্য ৯ বর্গমিটার জায়গা, ডিমের জন্য ৬.৩ বর্গমিটার। আর এক কিলো পাঁঠার মাংস পেতে বিচরণক্ষেত্র দরকার আনুমানিক ৩৭০ বর্গমিটার জায়গা। গোমাংসের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও বেশি বিচরণক্ষেত্র। সহজ কথায়, পরিমাণটা দুটো তিন কক্ষের ফ্ল্যাটের সম্মিলিত আয়তনের সমান। কিন্তু কিলোপিছু গম, চাল ও আলুর ফলনের জন্য যথাক্রমে ৩.৯, ২.৮ ও ০.৮৮ বর্গমিটার জায়গা হলেই হবে। অন্য ব্যাখ্যায় এটা বলা যায়, বিচরণক্ষেত্রর নিরিখে এক কিলো গোমাংস বর্জন করলে ৪১ কিলো দুধ, ১০০ কিলো গম, ৪২০ কিলো আলুর উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

তাহলে প্রাণীর মাংস বর্জন করলে পরিবর্ত কার্বোহাইড্রেট আসবে কোথা থেকে? ডঃ গুপ্ত বলেন, আধুনিক এআই-নিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব। ইজরায়েল-সহ নানা দেশে, এমনকি ভারতেও এমন ফলন হচ্ছে, যেটায় আমরা কৃত্রিম মাংসের স্বাদ পাবো। মাংসের পোকা না হলে কেউ সেসবে অনায়াসে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পারবেন। এমনকি ‘কালারিং, ফ্লেভারিং, টেক্সচার’ প্রভৃতির নিরিখে সেই ফলনে কৃত্রিম হাড়ও গুঁজে দেওয়া হচ্ছে। সুব্রতবাবু বলেন, ১০০০ বছর আগে বিশ্বে চাষ হতো ৪০ লক্ষ হেক্টর অর্থাৎ প্রাপ্ত জমির ৪ শতাংশে। আজ সারা বিশ্বে কর্ষণযোগ্য জমির পরিমাণ বেড়েছে। তাতেও ৩৭ শতাংশ জমি বনজঙ্গল, ১১ শতাংশ জমি পশুপ্রাণীর বিচরণযোগ্য, ১ শতাংশে নদী, হ্রদ প্রভৃতি। সব মিলিয়ে এখন মোট জমির ৭৭ শতাংশ চাষের উপযোগী। তার থেকে যদি আমরা ১০ শতাংশ ফলনের জন্য বার করে আনতে পারি, যথোপযুক্ত প্রযুক্তির প্রয়োগে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারি, তবে সংকট অনেকটা দূর করা সম্ভব।

ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি তথা প্রয়াত পরমাণু বিজ্ঞানী আভুল পাকির জয়নুলাবেদিন আবদুল কালামের কাজের বিশেষজ্ঞ, দেশের অন্যতম সেরা ক্ষেপনাস্ত্র-বিশেষজ্ঞ সুব্রত গুপ্ত বলেন, খাদ্যের সামগ্রিক চাহিদা বাড়ছে। আরও জল, আরও সার, আরও অনেক কিছু দিয়ে কৃষকদের ফলনবৃদ্ধির চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু মার খাচ্ছে ভারসাম্য। ১২ হাজার বছর আগে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৪০ লক্ষ। এখন লন্ডনেই এর দ্বিগুণ লোক। ১৮০০ সালে ছিল ১০০ কোটি। খ্রিষ্টপূর্ব ১০ হাজার সাল থেকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জনসংখ্যা বেড়েছে ০.০৪ শতাংশ হারে। আমরা এই পরিবর্তনের হার আর পরিবেশকে নিজেদের অনুকূলে আনতে পারিনি। কিয়োটো প্রটোকল থেকে বিভিন্ন দেশ মাথা ঘামাচ্ছে। সওয়া দু’শ বছরে ৮ গুণ বেড়ে গিয়েছে। বর্তমান নিরিখে খাদ্যের ফলন এখন প্রায় সর্বোচ্চ। বিশ্বে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি হয়েছে। ২০৫০-এ তা এক হাজার কোটি ছাড়াবে। অতঃ কিম?

একাধিক বিশ্বযুদ্ধ, দুর্যোগ প্রভৃতি কারণে একসময় জনসংখ্যাবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক ছিল। অবলোপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। নানাভাবে সেই শঙ্কা দূর করা গিয়েছে। মৃত্যুর হার আগের তুলনায় কমেছে। কিন্তু এখন ফি বছর বিশ্ব জনসংখ্যা বাড়ছে প্রায় ৮ কোটি। এত বিপুল মানুষের মুখে অন্ন পৌঁছানো যাবে কী করে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে এই প্রশ্নের সমাধান খুঁজতেই হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে খাদ্যের উৎপাদন ৫৬ শতাংশ বাড়াতেই হবে। এর জন্য দরকার ৬০ কোটি হেক্টর জমি। যা ভারতের আয়তনের দ্বিগুণ। অত জমি কোথায়?

১৯০৮ সালে আমেরিকান নাগরিক হিসাবে চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেলজয়ী জার্মান বিজ্ঞানী পল এরলিশ (২৯-৫-১৯৩২ — ১৩-৩-২০২৬) ছিলেন। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৯০ সালে বিখ্যাত ক্রাফোর্ড (Crafoord) পুরস্কার পান।জীববিজ্ঞানী, লেখক, পরিবেশবিদ ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা অধ্যয়নের অধ্যাপক হিসাবে তিনি জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত বই ‘The Population Bomb’ তাঁকে পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে পরিচিত করে তোলে। তাতে তিনি ভবিষ্যৎ ব্যাপক খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা প্রকাশ করে বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত জনসংখ্যা নিয়ে চিন্তাভাবনার জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর উক্তি পেশ করেন সুব্রত গুপ্ত।

ডঃ গুপ্ত বলেন, কৃষি-প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি হয়েছে। ১৯৬১-তে যে পরিমাণ ফসল হত, তার ৩০ শতাংশ কম জমিতে সম-পরিমাণ ফলন পাচ্ছি। কিন্ত আরও সতর্ক হতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে ফলনের গতিবৃদ্ধি রুদ্ধ হচ্ছে। বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ছে। প্রজাপতি-মৌমাছির মাধ্যমে কৃষিতে যে ইতিবাচক ফল পেতাম, তা কমে গিয়েছে। বিপদ তৈরি করছে গ্রিনহাউস গ্যাস। এর প্রায় ৭৬ শতাংশ আসে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহণ, কলকারখানা, তাপ-নিয়ন্ত্রণের মতো বৈদ্যুতিন নানা যন্ত্র থেকে। গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রায় ২৪ শতাংশ আসে বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা থেকে। এই সঙ্গে কৃষিকাজে জল, সার, কীটনাশক প্রভৃতির অপচয়ের মাত্রা কমানোর ওপর জোর দেন ডঃ গুপ্ত। এর জন্য ‘ড্রিপ ইরিগেশন’-এর আবশ্যিকতার উল্লেখ করেন। বলেন, অবিভক্ত বর্ধমান জেলায় ৩০টি ব্লকের ১৩টিতে জলস্তর নেমে গিয়েছে। আগামী প্রজন্মের লোকেরা জল পাবেন কোথায়?

কী, কী ভাবে এই অপচয় হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করে সমাধানের পথ হিসাবে তিনি সেচে ’The Internet of Things’ (আইওটি) রূপায়ণের আশু প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, কোন ফলনে, কখন, ঠিক কতটা জল লাগবে তা প্রযুক্তি বলে দেবে। ৬ মাস আগে এআই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে দেবে। এ প্রসঙ্গে ‘অ্যাক্সেলারেটেড রিসাইলেন্স’-এর প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। তানজানিয়ার ‘আর্টেমিস’ প্রকল্পে কিভাবে কম্পিউটার-নিয়ন্থ্রিত ড্রোন ব্যবহার করে সুফল পাওয়া গিয়েছে, এ প্রসঙ্গে সেটিরও উল্লেখ করেন সুব্রতবাবু। আর্টেমিসে অংশগ্রহণকারী চাষিরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে তাদের ফসলের ছবি তোলেন। প্রশিক্ষিত AI তখন দ্রুত তা বিশ্লেষণ, রেকর্ড ও রিপোর্ট করতে পারে। কম্পিউটার ক্লান্ত না হয়ে প্রতিটি উদ্ভিদের প্রতিটি ফুল, প্রতিটি শুঁটি গুণতে পারে! তারপর ফুলের সংখ্যাকে শুঁটির সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে সরাসরি ফলনকে প্রভাবিত করে। AI কম্পিউটার ভালো তথ্যের সঙ্গে, উদ্ভিদ প্রজনন চক্রকে সংক্ষিপ্ত করতে পারে।

এই সঙ্গে কৃষিতে ‘জেনোটাইপিং’-এর গুরুত্বের কথাও তিনি বলেন। সুব্রতবাবু জানান, “কোন জিনে ভালো ফলন হবে, এদিকটায় নজর রাখা আবশ্যিক”। তিনি বলেন, একদিকে শষ্য উৎপাদনে বিপুল অপচয়। অন্যদিকে, খাদ্যের পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, নির্ধারিত তারিখ অর্থাৎ মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া প্রভৃতি বিভিন্ন পর্যায়ে অপচয় ও অসম বন্টন একটা বড় সমস্যা। এই সঙ্গে, প্রায় ৮০ কোটি লোক অপুষ্টি বা ক্ষুধার শিকার। কেবল ইওরোপ-আমেরিকার অপচয় রোধ করতে পারলে এই অপুষ্টি/ক্ষুধার মাত্রায় অনেকটা লাগাম দেওয়া সম্ভব।
প্রাণীজ প্রোটিনের পরিবর্তের কথা জানিয়েছেন ডঃ গুপ্ত। তাঁর মতে, “প্রাণীজ প্রোটিনের ভোগ একটি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও হয়ে উঠেছে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ একটি গুরুতর চিকিৎসাগত সমস্যা। ইতিমধ্যে প্রতি বছর এর জন্য প্রায় ১৩ লক্ষ মৃত্যু হচ্ছে। বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের ৭০ শতাংশ খামারের প্রাণীদের দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ক্রমবর্ধমান এই সমস্যার কারণ শিল্পায়িত প্রাণী পালন। এছাড়া, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি অনুসারে, পরবর্তী মহামারীর দুটি সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হল বৈশ্বিক মাংস ভোগ বৃদ্ধি এবং মাংস উৎপাদনের শিল্পায়িত পদ্ধতি, যার উভয়ই মানুষের মধ্যে ‘জুনোটিক’ রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ায়।
বিকল্প প্রোটিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও জুনোটিক রোগের ঝুঁকিতে শিল্পায়িত প্রাণী পালনের অপরিহার্যতা কমায়। কারণ এগুলি জীবন্ত প্রাণী বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে না। বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থায় বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয় ৩৪ শতাংশ, এবং এর অর্ধেক আজকের প্রোটিন উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য দায়ী। এই পরিমাণ নিঃসরণ সমস্ত খাত থেকে মোট মার্কিন নিঃসরণকে ছাড়িয়ে যায়। খাদ্য ব্যবস্থার নিঃসরণ আসে গবাদি পশু ও পশুখাদ্য উৎপাদনের জন্য বন উজাড়, পশুখাদ্য ফসল থেকে নিঃসরণ এবং মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড সহ সরাসরি নিঃসরণ থেকে। বৈশ্বিক মিথেন নিঃসরণের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে রোমন্থক প্রাণীর মিথেন ও সার থেকে।

মাংসের চাহিদা মাথাপিছু জিডিপির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে। ২০২০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে, বৈশ্বিক মাংসের চাহিদা ৪০ থেকে ১০০ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যদি মাংস উৎপাদন পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন না হয়, তবে এমন বৃদ্ধি কেবল গবাদি পশু ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকেই বছরে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ গিগাটন CO2-eq সৃষ্টি করবে। উদ্ভিদভিত্তিক মাংস উৎপাদনে তিনটি প্রাথমিক ধাপ রয়েছে। প্রথমত, কাঁচামালের উৎস হিসেবে ফসল ফলানো হয়; দ্বিতীয়ত, এই ফসলগুলি প্রক্রিয়াজাত করে উদ্ভিদের অপ্রয়োজনীয় অংশগুলি বাদ দেওয়া হয়। এই পর্যায়ে, পণ্যে সেই প্রোটিন, চর্বি ও ফাইবার উপাদান থাকে যা উদ্ভিদভিত্তিক মাংস পণ্যে পরিণত হয়। কাঙ্ক্ষিত উপাদানের মিশ্রণ তৈরি করা হয় এবং এটি মাংসের জন্য প্রয়োজনীয় পেশি-সদৃশ গঠন তৈরি করতে একটি উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। চাষকৃত মাংস, যা কালচারড মাংস নামেও পরিচিত।
সামুদ্রিক খাদ্য হল প্রাণী কোষ থেকে সরাসরি চাষ করা প্রকৃত প্রাণীর মাংস। এই উৎপাদন পদ্ধতি খাদ্যের জন্য প্রাণী পালন ও চাষের প্রয়োজনীয়তা দূর করে। চাষকৃত মাংস একই কোষ ধরনের তৈরি যা প্রাণী টিস্যুর মতো একই বা অনুরূপ কাঠামোতে বিন্যস্ত করা যায়, উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয় একটি প্রাণী থেকে স্টেম কোষ অর্জন ও সংরক্ষণের মাধ্যমে। তারপর উচ্চ ঘনত্ব ও আয়তনে বায়োরিয়্যাক্টরে বৃদ্ধি করা হয়। প্রাণীর দেহের ভেতরে যা ঘটে তার মতোই, কোষগুলিকে অ্যামিনো অ্যাসিড, গ্লুকোজ, ভিটামিন ও অজৈব লবণের মতো মৌলিক পুষ্টি দিয়ে তৈরি একটি অক্সিজেন-সমৃদ্ধ কোষ কালচার মাধ্যম খাওয়ানো হয়। পরিপূরক করা হয় বৃদ্ধি কারক ও অন্যান্য প্রোটিন দিয়ে।

scaffolding কাঠামোয় মিলিতভাবে, অপরিণত কোষগুলিকে পেশি, চর্বি ও সংযোগকারী টিস্যুতে বিভাজিত হয়ে মাংস তৈরি করে। বিভাজিত কোষগুলি তখন সংগ্রহ, প্রস্তুত ও চূড়ান্ত পণ্যে প্যাকেজ করা হয়। এই প্রক্রিয়া কী ধরনের মাংস চাষ করা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে ২-৮ সপ্তাহ সময় নেয়। কিছু কোম্পানি দুধ ও অন্যান্য প্রাণীজ পণ্য তৈরিতে অনুরূপ কৌশল অনুসরণ করছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ (কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য, বা CO2eq। নন-CO2 গ্যাসগুলিকে ১০০ বছরের সময়সীমায় তারা যে পরিমাণ উষ্ণায়ন ঘটায় তার দ্বারা ওজন দেওয়া হয়) প্রতি কিলোগ্রাম খাদ্য পণ্যে খাদ্য পণ্যের পরিবেশগত প্রভাবের একটি ভালো পরিমাপ। কিছু জনপ্রিয় মাংস, সবজি ও শস্যের জন্য নিঃসরণ হল: গরুর মাংস ৯৯.৪৮ কেজি, ভেড়া ও মাটন ৩৯.৭২ কেজি, চিংড়ি ২৬.৮৭ কেজি, পনির ২৩.৮৮ কেজি, শূকরের মাংস ১২.৩১ কেজি, হাঁস-মুরগির মাংস ৯.৮৭ কেজি, ডিম ৪.৬৭ কেজি, চাল ৪.৪৫ কেজি, দুধ ৩.১৫ কেজি, টমেটো ২.০৯ কেজি, ভুট্টা ১.৭ কেজি, গম ১.৫৭ কেজি, মটর ০.৯৮ কেজি, কলা ০.৮৬ কেজি, আলু ০.৪৬ কেজি এবং বাদাম ০.৪৩ কেজি।”
সুব্রত গুপ্ত পাওয়ার পয়েন্টে পরিসংখ্যানের হিসেব দাখিল করে বলেন, একদিকে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, নগরায়নের প্রয়োজনে কর্ষণযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। ২০৫০ সালে এত মানুষ খাবে কী? অন্যদিকে, বিভিন্ন দেশ মাথাপিছু ‘কনসাম্পশন’ বাড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ। পরিবেশের বদল ও আবহাওয়াজনিত নানা কারণে বিভিন্ন ফসলের নতুন নতুন রোগ দেখা দিচ্ছে। প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে আমাদের সামগ্রিক ফলনের পরিমাণ বাড়ানো আবশ্যিক। অন্যথায় পায়ে পায়ে এগিয়ে আসবে শেষের সেই ভয়ঙ্কর অশনি সংকেত।

সুব্রত গুপ্ত পাওয়ার পয়েন্টে পরিসংখ্যানের হিসেব দাখিল করে বলেন, একদিকে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, নগরায়নের প্রয়োজনে কর্ষণযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। ২০৫০ সালে এত মানুষ খাবে কী? অন্যদিকে, বিভিন্ন দেশ মাথাপিছু ‘কনসাম্পশন’ বাড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ। পরিবেশের বদল ও আবহাওয়াজনিত নানা কারণে বিভিন্ন ফসলের নতুন নতুন রোগ দেখা দিচ্ছে। প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে আমাদের সামগ্রিক ফলনের পরিমাণ বাড়ানো আবশ্যিক। অন্যথায় পায়ে পায়ে এগিয়ে আসবে শেষের সেই ভয়ঙ্কর অশনি সংকেত।


Recent Comments