সুন্দরবনের বঞ্চিত মৎস্যজীবীদের সমস্যা নিয়ে ৮ দফা প্রধান বিষয়বস্তু তুলে দাবিপত্র পেশ করল পশ্চিমবঙ্গ মৎস্যজীবী ইউনিয়ন, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটি।
কমিটির সম্পাদক সুকান্ত সরকার ও সভাপতি গোবিন্দ দাস সোমবার জানান, আমাদের ৮ দফা প্রধান বিষয়বস্তু হ’ল-
১. BLC বাতিলের পরিকল্পনা বন্ধ করে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে-
সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের আওতায় প্রকৃত মৎস্যজীবীদের BLC (Boat License Certificate) অন্যায়ভাবে বাতিল করার যে কোনো পরিকল্পনা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। মৎস্যজীবীদের পাস, পারমিট ও BLC প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত করতে হবে।
সম্প্রতি ৯৪ জন BLC মালিককে শোকজ করা হয়েছে এবং তাঁদের BLC-সংক্রান্ত বিষয়ে সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ (STR) দপ্তরে শুনানি চলছে। শুনানি চলাকালীন সংশ্লিষ্ট BLC অন্য ব্যক্তির নামে অস্থায়ীভাবে ইস্যু বা হস্তান্তরের যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। শুনানি সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মৎস্যজীবীদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে হবে।
২. BLC Mutation প্রক্রিয়া অবিলম্বে পুনরায় চালু করতে হবে-
প্রকৃত ও ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবীদের বৈধ অধিকার সুরক্ষিত রাখতে BLC Mutation প্রক্রিয়া অবিলম্বে পুনরায় চালু করতে হবে। কোনোভাবেই তাঁদের দীর্ঘদিনের অধিকার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া যাবে না।
৩. বাঘ ও কুমিরের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সুরক্ষা দিতে হবে-
বাঘের আক্রমণে স্বামীহারা বাঘ বিধবাদের জন্য মাসিক ₹১০,০০০ ভাতা চালু করতে হবে। বাঘ বা কুমিরের আক্রমণে কোনো মৎস্যজীবীর মৃত্যু বা অঙ্গহানি হলে দ্রুত ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অন্তত একজন সদস্যের জন্য স্থায়ী বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. যৌথ সমন্বয় কমিটি গঠন করতে হবে-
Forest Department, Fisheries Department এবং মৎস্যজীবী ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ সমন্বয় কমিটি (PPP Model) গঠন করতে হবে। এই কমিটির মাধ্যমে মৎস্যজীবীদের সমস্যা নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করে দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. বিশেষ বীমা, জরুরি আর্থিক সহায়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করতে হবে-
সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ জীবন ও দুর্ঘটনা বীমা প্রকল্প চালু করতে হবে। বিপদগ্রস্ত মৎস্যজীবী ও তাঁদের পরিবারের জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্রুত উদ্ধার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা, GPS এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৬. নিরাপদে মাছ ধরার অধিকার ও পরিচয়পত্র নিশ্চিত করতে হবে-
সুন্দরবনের নদী ও জলপথে প্রকৃত ও ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবীদের আইনসম্মত, নিরাপদ ও ন্যায্যভাবে মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের জন্য সরকারি স্বীকৃত পরিচয়পত্র এবং ডিজিটাল Fishermen Card চালু করতে হবে।
৭. Ban Period-এ বিশেষ আর্থিক সহায়তা দিতে হবে-
মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় (Ban Period) মৎস্যজীবী পরিবারগুলিকে মাসিক ₹৫,০০০ বিশেষ ভাতা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত চাল, রেশন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে নিষেধাজ্ঞার সময় কোনো মৎস্যজীবী পরিবার অনাহার বা চরম আর্থিক সংকটে না পড়ে।
৮. শিক্ষা, চিকিৎসা ও Fishermen Welfare Board গঠন করতে হবে-
সুন্দরবনের মৎস্যজীবী পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার জন্য বিশেষ সরকারি অনুদান, বৃত্তি ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের জন্য উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। মৎস্যজীবীদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি Fishermen Welfare Board গঠন করতে হবে।
সুন্দরবনের প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ, নদী-সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে মৎস্যজীবীরা জীবন বাজি রেখে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁদের শ্রম ও ত্যাগ রাজ্য তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সুন্দরবনের অধিকাংশ প্রকৃত ও ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবী আজও তাঁদের ন্যায্য অধিকার, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
সুন্দরবনের প্রকৃত ও ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা, অধিকার, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, Eco-Tourism-এর নামে সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা বন্ধ করে দেওয়া বা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুন্দরবনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি সুন্দরবনের মানুষের জীবন-জীবিকা, অধিকার ও নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সুন্দরবনের প্রকৃত রক্ষক হলেন সেই মৎস্যজীবীরা, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলের নদী, খাল, বন ও জলজ সম্পদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তাঁদের বাদ দিয়ে সুন্দরবনের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
মৎস্যজীবী বাঁচলে, সুন্দরবনও বাঁচবে। অতএব, আমরা সরকারের কাছে জানাচ্ছি—উপরোক্ত বিষয়গুলির বিষয়ে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সুন্দরবনের প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা, ন্যায্য অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা হোক।


Recent Comments