একের পর এক বাঁধ ভাঙন, গঙ্গার জলে প্লাবিত জনপদ, ক্ষতির মুখে হাজার হাজার মানুষ। প্রতি বছর একই ছবি, একই আতঙ্ক। মালদার মানিকচকের ভূতনি চরাঞ্চলে গঙ্গা নদীর ভাঙনে ক্রমশ বাড়ছে উদ্বেগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে বারবার অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বালিভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন রোখার চেষ্টা হলেও তা কোনওভাবেই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। ফলে বছরের পর বছর বন্যা ও নদীভাঙনের আতঙ্ক নিয়েই দিন কাটাতে হচ্ছে ভূতনিবাসীকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ভূতনির বাঁধ ভেঙে হিরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার অন্তর্গত কিশোরপুর কলোনি দিয়ে জল ঢুকতে শুরু করে। সেই জল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভূতনির তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকায়। ইতিমধ্যেই অধিকাংশ নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। গঙ্গার জলস্তর আরও বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভূতনির বাসিন্দা তথা স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ভোলানাথ মণ্ডল জানান, গত কয়েক বছর ধরেই একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে ভূতনিবাসীকে। তাঁর অভিযোগ, বাঁধ ভাঙলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে বালিভর্তি বস্তা ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন আটকানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নদীর প্রবল স্রোত ও মাটির ক্ষয়ের কারণে সেই ব্যবস্থা বেশিদিন টেকে না। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই ফের বাঁধে ধস নামে এবং নদীর জল গ্রামে ঢুকে পড়ে।
ভোলানাথ মণ্ডলের কথায়, ভূতনির মানুষের মূল জীবিকা কৃষিকাজ। এই এলাকার মাটি অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় ধান, পাট-সহ বিভিন্ন ফসলের ভালো ফলন হয়। কিন্তু প্রতিবছর বন্যার কারণে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে পাট কাটার ও সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গ্রামে জল ঢুকে যাওয়ায় বহু কৃষকের পাট ও অন্যান্য ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষিনির্ভর পরিবারের কাছে এই ক্ষতি অত্যন্ত বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ভূতনির অধিকাংশ মানুষের বাড়িঘরও কাঁচা হওয়ায় বন্যার সময় বিপদের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। জল ঢুকে পড়লে বহু পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া, খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করা হলেও স্থানীয়দের দাবি, শুধু ত্রাণ ও অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাই নয়, বন্যার প্রভাব পড়ছে শিশুদের পড়াশোনাতেও। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর বন্যা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। এ বছরও প্রায় এক মাস স্কুল বন্ধ থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে।
এদিকে, এক বছর আগে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হওয়া ভূতনির রিং বাঁধও গঙ্গার জলের প্রবল স্রোতে ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বাঁধ নির্মাণের গুণগত মান নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা খরচ করেও স্থায়ী ও মজবুত বাঁধ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও কোথাও নতুন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে জল ঢুকতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ ইঞ্জিনিয়ারিং পরিকল্পনা ও দক্ষ প্রযুক্তিগত তদারকির অভাব রয়েছে। বাঁশ, বালিভর্তি বস্তা এবং অস্থায়ী উপকরণ দিয়ে বারবার ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হলেও তা নদীর প্রবল স্রোতের সামনে টিকছে না। তাঁদের দাবি, সরকার বাঁধ নির্মাণের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করলেও সেই কাজ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনা অনুযায়ী করা প্রয়োজন।
গত তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বন্যা ও ভাঙনের মুখোমুখি হওয়া ভূতনির মানুষ এবার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে সরব হয়েছেন। তাঁদের একটাই দাবি—গঙ্গা নদীর তীরে পরিকল্পিত ও শক্তিশালী কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণ করা হলে ভূতনির বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার ভয়াবহতা থেকে অনেকটাই রক্ষা পাবে।
এদিকে বাঁধ ভাঙনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। মানিকচকের বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডল বাঁধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সঠিকভাবে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ার ফল এখন ভূতনির সাধারণ মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক তরজা নয়, ভূতনির মানুষের এখন সবচেয়ে বড় দাবি স্থায়ী সমাধান। প্রতি বছর বালিভর্তি বস্তা ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন রোধের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি সুপরিকল্পিত ও মজবুত কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ করা হোক—এই দাবিই এখন ভূতনির সর্বস্তরের মানুষের। কারণ তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আগামী দিনেও একইভাবে গঙ্গার ভাঙন ও বন্যার সঙ্গে লড়াই করেই জীবন কাটাতে হবে এই চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষকে।


Recent Comments