পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ শুরু হতেই ফের খবরের শিরোনামে সেই অতি পরিচিত নাম—ভাঙড় (Bhangar)। রাজনৈতিক দিক থেকে বরাবরই এই এলাকাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং বারুদের স্তূপ হিসেবে পরিচিত। প্রথম দফার পর দ্বিতীয় দফাতেও অশান্তির কালো ছায়া যেন এই এলাকা থেকে কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। আজ সকাল থেকে উৎসবের মেজাজে মানুষের ভোট দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে বুথ সংলগ্ন এলাকার ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাতসকালেই নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে রীতিমতো ফ্যাঁসাদে পড়েছেন সাধারণ ভোটাররা।
স্থানীয় সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, মূলত উত্তেজনা ছড়িয়েছে এলাকার ২৩৩ এবং ২৩৪ নম্বর বুথের সামনে। সকাল থেকেই এই দুটি বুথের বাইরে ভোটারদের লম্বা লাইন চোখে পড়েছিল। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, পরিস্থিতি ততই জটিল ও উত্তপ্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথেই তাদের আটকে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে বুথের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন না বলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।এই গোটা ঘটনার নেপথ্যে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন স্থানীয়রা এবং বিরোধী শিবিরের কর্মীরা।
বিরোধী দলের সমর্থক এবং বেশ কিছু সাধারণ ভোটারের দাবি, ২৩৩ এবং ২৩৪ নম্বর বুথের বাইরে সকাল থেকেই শাসক দলের বেশ কিছু বহিরাগত দুষ্কৃতী জমায়েত করেছিল। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। অভিযোগ, ভোটারদের ভয় দেখিয়ে বুথমুখো হতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং এলাকায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি, কোনো কোনো ভোটারের পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (Indian Secular Front) বা আইএসএফ-এর বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী (Naushad Siddique)। বুথের বাইরে সাইহাটি (Saihati) এলাকায় পৌঁছাতেই তাঁকে স্থানীয়দের প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। অভিযোগ, সেখানে উপস্থিত তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) কর্মীরা তাঁকে ঘিরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে থাকেন। বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন যে, এলাকার উন্নয়নে বিধায়ককে সেভাবে পাশে পাওয়া যায়নি। এই বিক্ষোভের কড়া জবাব দিয়ে নওশাদ বলেন, “এরা শাসকদলের এজেন্ট। আমি এই এলাকায় ইতিমধ্যেই ৩০ লক্ষ টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করেছি।”
বোমাবাজি ও হুমকির অভিযোগপরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন আগের রাতের অশান্তির খবর সামনে আসে। অভিযোগ ওঠে ব্যাপক বোমাবাজি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়া এবং সংঘর্ষের, যাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। নওশাদ শাসকদলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ভোটারদের ভয় দেখিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টার গুরুতর অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, “গত রাত থেকেই, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে যেমনটা দেখা যাচ্ছে, ( ভিডিও এর সত্যতা জচাই করে নি newsscop digital)প্রধান বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে ভোট না দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। কিছু জায়গায় বোমাও ছোড়া হয়েছে।”তবে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে যোগ করেন, “আমি আপনাদের একটা কথা পরিষ্কার বলতে চাই, ভাঙ্গরের মানুষ ভয় পাবে না। এখানকার মানুষ প্রস্তুত। আমরা ওদের পরাজিত করে বাড়ি পাঠাব এবং ৫০,০০০-এর বেশি ভোটের ব্যবধানে আবারও বিধানসভায় প্রবেশ করব।” তিনি আরও জানান যে গতকাল থেকে ঘটে চলা প্রতিটি ঘটনার প্রমাণ এবং রিপোর্ট তাঁরা ইমেইলের মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী শওকত মোল্লা (Saokat Molla) এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি সরাসরি পুলিশের বিরুদ্ধে ‘গুন্ডাগিরি’-র অভিযোগ এনেছেন। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “গত রাতে আমরা যা দেখেছি তা আগে কখনও দেখিনি। পুলিশ গুন্ডামি করছিল। কিছু পুলিশ কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজা ভেঙেছে। তারা বেশ কয়েকজনকে মারধর করেছে, যারা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।”তাঁর দাবি, সারা রাত ধরে চলা এই তাণ্ডব আসলে ভোটারদের ভয় দেখানোর একটি চক্রান্ত। তবে তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, দলের কর্মী-সমর্থকরা এতে ভয় পাবে না এবং নির্বাচনের রায় তাঁদের পক্ষেই যাবে। নওশাদের আনা বোমাবাজির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “এর মধ্যে কোনও সত্যতা নেই। এটি একটি ছোটখাটো সমস্যা ছিল যেখানে উভয় পক্ষের লোকজনই সামান্য আহত হয়েছে। নিজের সমর্থকদের দিয়ে বিরোধী বিধায়ক এসব মিথ্যে দাবি করাচ্ছেন।”


Recent Comments