দীর্ঘদিন ধরে বুকে চেপে রাখা ক্ষোভের অবশেষে চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটল। সাধারণ মানুষের পিঠ যখন একেবারে দেওয়ালে ঠেকে যায়, তখন প্রতিবাদের ভাষা যে কতটা তীব্র ও ভয়ংকর হতে পারে, বৃহস্পতিবার সকালে তার চাক্ষুষ প্রমাণ পেল কলকাতা (Kolkata) শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এন্টালি (Entally)। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) বা টিএমসি-র এক অত্যন্ত প্রভাবশালী পিতা-পুত্র জুটির বিরুদ্ধে এবার সরাসরি রাস্তায় নেমে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন এলাকার ভুক্তভোগী মানুষ।
স্থানীয় মানুষের এই ক্ষোভের নিশানায় রয়েছেন এন্টালির প্রাক্তন দাপুটে বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহা (Swarnakamal Saha) এবং তাঁরই ছেলে তথা ওই একই বিধানসভা কেন্দ্রের বর্তমান শাসক দলের বিধায়ক সন্দীপন সাহা (Sandipan Saha)। অভিযোগ একেবারেই সাধারণ নয়, বরং যথেষ্ট মারাত্মক। স্থানীয়দের দাবি, দিনের পর দিন ধরে গোটা এলাকা জুড়ে ব্যাপক তোলাবাজি চলছে। সাধারণ মানুষের সারাজীবনের রক্তজল করা পরিশ্রমে কেনা জমি ও স্বপ্নের ফ্ল্যাট জোরপূর্বক দখল করে নিচ্ছে এই নেতাদের অনুগামীরা। কেউ এর সামান্যতম প্রতিবাদ করার সাহস দেখালে তাঁর জুটছে চরম হুমকি ও শারীরিক নিগ্রহ। এই সিন্ডিকেটের দাপটে সাধারণ মানুষের একেবারে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়েছিল বলে দাবি বিক্ষোভকারীদের।
স্থানীয় বেশ কয়েকটি সূত্রের দাবি, গত কয়েক বছর ধরেই এই এলাকার প্রোমোটিং এবং জমি কেনাবেচা নিয়ে একটি অলিখিত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী চক্র কাজ করছে। কেউ নতুন বাড়ি তৈরি করতে গেলে বা পুরনো বাড়ি সংস্কার করতে গেলেও নাকি এই প্রভাবশালী নেতাদের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীদের কাছে মোটা অঙ্কের ‘কাটমানি’ পৌঁছে দিতে হতো। যাঁরা এই বেআইনি ও অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করতে অস্বীকার করতেন, তাঁদের কপালে জুটত অকথ্য গালিগালাজ এবং এলাকাছাড়া করার হুমকি। এমনকি, অনেক নিরীহ মানুষের ফ্ল্যাট বা জমি সম্পূর্ণ গায়ের জোরে দখল করে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বাঁধ চিরতরে ভেঙে যায়। সকাল থেকেই স্বর্ণকমল এবং সন্দীপনের বিলাসবহুল বাড়ির সামনে ধীরে ধীরে জড়ো হতে শুরু করেন এলাকার শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জমায়েত এক বিশাল ও উত্তাল বিক্ষোভের রূপ নেয়। বিক্ষুব্ধ জনতার গগনভেদী স্লোগানে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। তাঁদের একটাই স্পষ্ট দাবি— অবিলম্বে এই তোলাবাজি, ভীতি প্রদর্শন ও জমি দখলের নোংরা রাজনীতি বন্ধ করতে হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোরতম শাস্তি দিতে হবে।
তবে এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের উত্তাপকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় বিরোধী দল বিজেপি (BJP)-র এক নেত্রীর আকস্মিক আগমন। সাধারণ মানুষের এই ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সামিল হয়ে তিনি সরাসরি একগাছি জুতোর মালা হাতে নিয়ে হাজির হন অভিযুক্ত বিধায়ক ও তাঁর বাবার বাড়ির একেবারে দোরগোড়ায়। এই দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে গোটা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে দেয়। প্রকাশ্যে জুতোর মালা প্রদর্শন করে তিনি যেন বুঝিয়ে দেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিরোধী দলও এবার আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক তরজাও চরমে উঠেছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী কয়েকজন বাসিন্দা কান্নাজড়িত কণ্ঠে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজেদের চরম দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বারবার ছুটে গিয়েও কোনও সুরাহা মেলেনি, উল্টে পুলিশের একাংশ নাকি প্রভাবশালীদেরই আড়াল করার চেষ্টা করেছে। তাই সব দরজা বন্ধ দেখে বাধ্য হয়েই আজ তাঁদের পথে নামতে হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী।


Recent Comments