গণতান্ত্রিক দেশের অন্যতম মূল স্তম্ভ হল অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন। সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা থাকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর। কিন্তু সেই ভোট প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েই এবার একরাশ বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন তৃণমূল (Trinamool) কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। রবিবার জনপ্রিয় সমাজমাধ্যম এক্স (X)-এ একটি দীর্ঘ এবং কড়া পোস্ট করে তিনি ফলতা (Falta) বিধানসভা বা এসি (AC)-র পুনর্নির্বাচনের ভোটগণনা এবং ভারতের (India) নির্বাচন কমিশন বা ইসিআই (Election Commission of India – ECI)-এর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তাঁর দাবি, আজকের ভোটগণনা প্রক্রিয়ায় এমন কিছু চাঞ্চল্যকর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে, যার উত্তর গোটা দেশ আজ নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চাইছে।ভোটগণনার গতিতে আকাশপাতাল তফাৎঅভিষেক তাঁর রবিবারের পোস্টে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন যা রাজনৈতিক মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। তিনি জানিয়েছেন, আজকের পুনর্নির্বাচনের গণনার ক্ষেত্রে দুপুর সাড়ে ৩টের মধ্যেই সমস্ত ২১টি রাউন্ডের গণনা সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। অথচ, গত ৪ঠা মে যখন এই একই কেন্দ্রে প্রথমবার ভোটগণনা চলছিল, তখন এই একই সময়ের মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৪ রাউন্ড গণনা করা সম্ভব হয়েছিল। একই প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং একই সংখ্যক কর্মী থাকা সত্ত্বেও দুই দিনে গণনার এই চরম তারতম্য কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে তিনি গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
তাঁর মতে, কমিশনের উচিত অবিলম্বে এই ঘটনার একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেশের মানুষের সামনে পেশ করা।সন্ত্রাস, ঘরছাড়া কর্মী এবং কমিশনের নীরবতাএদিন শুধুমাত্র ভোটগণনার ঘরের ভেতরের অসঙ্গতিতেই থেমে থাকেননি শাসক দলের এই শীর্ষ নেতা। তিনি এলাকার বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর গুরুতর অভিযোগ, গত ১০ দিনে ওই এলাকার ১০০০-এরও বেশি দলীয় কর্মীকে ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক এলাকাছাড়া করা হয়েছে। বাড়িছাড়া মানুষগুলো চরম আতঙ্কে দিন কাটালেও নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ বিষয়টি জেনেও কার্যত ধৃতরাষ্ট্রের মতো চোখ বন্ধ করে বসে আছে।
এমনকি, যখন এলাকায় নির্বাচনী আদর্শ আচরণবিধি বা এমসিসি (Model Code of Conduct – MCC) সম্পূর্ণভাবে বলবৎ ছিল, ঠিক সেই সংবেদনশীল সময়েও প্রকাশ্য দিবালোকে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়গুলিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এত কিছুর পরেও প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো ন্যূনতম ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।শীর্ষ আধিকারিকের ভূমিকা এবং বিতর্কিত পদোন্নতিঅভিষেকের অভিযোগের তির সরাসরি রাজ্যের প্রশাসনিক রদবদলের দিকেও ধেয়ে গেছে।
তিনি তাঁর পোস্টে দাবি করেছেন, রাজ্যের তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও (Chief Electoral Officer – CEO), যাকে ব্যবহার করে ইসিআই এসআইআর (SIR)-এর আড়ালে ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে নাম বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চক্রান্ত করেছিল, তাকে শাস্তি দেওয়ার বদলে কার্যত পুরস্কৃত করা হয়েছে।
ফলতায় যখন আদর্শ আচরণবিধি সচল ছিল এবং ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া তখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়নি, ঠিক সেই সময়েই নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal – WB) সরকারের মুখ্যসচিব (Chief Secretary) হিসেবে ওই বিতর্কিত আধিকারিককে নিয়োগ করা হয়। এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাকে এক বিশাল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিরোধী এজেন্টদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করার অভিযোগগত ৪ মে-র গণনা প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত ভীতিপ্রদ অভিজ্ঞতার কথাও এদিন বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন তৃণমূল নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, ওই দিন কমিশনের অধীনে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং নিরাপত্তায় মোতায়েন থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Forces) সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তৃণমূল এবং অন্যান্য সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের কাউন্টিং এজেন্টদের গণনা কেন্দ্রের বাইরে বের করে দেয়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বেআইনি পদক্ষেপ থেকে ছাড় পেয়েছিল শুধুমাত্র বিরোধী দল বিজেপি (BJP)। অর্থাৎ কেবলমাত্র তাদের এজেন্টরাই ভেতরে অবাধে থাকার এবং প্রভাব খাটানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। এই ধরনের প্রকাশ্য বৈষম্যমূলক আচরণ একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ এবং এটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারণাকেই শিকড় থেকে ধ্বংস করে দেয়।সিসিটিভি অডিটের জোরালো দাবিএই গোটা ঘটনাক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন, এই দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের যদি অবিলম্বে জবাবদিহির আওতায় আনা না হয় এবং সম্পূর্ণ গণনা প্রক্রিয়ার একটি স্বাধীন সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ অডিট করা না হয়, তবে এই জনাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন এবং ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তেই থাকবে।
নিজের পোস্টের শেষে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে একটি অমোঘ বার্তা দিয়েছেন, “সত্যকে চিরকাল জোর করে চাপা দিয়ে রাখা যায় না!”একজন সাংবাদিক হিসেবে এই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফলতার এই নির্বাচন নিছক একটি কেন্দ্রের জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্বচ্ছতা রক্ষার একটি বড় পরীক্ষা। সাধারণ মানুষ এখন উত্তরের অপেক্ষায় নির্বাচন কমিশনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।


Recent Comments