স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের দুনিয়া কি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে আমাদের আগামী প্রজন্মকে? গাজিয়াবাদের (Ghaziabad) ভারত সিটির একটি আবাসন থেকে উঠে আসা মর্মান্তিক ঘটনা সেই প্রশ্নই আরও জোরালো করে তুলল। কোরিয়ান সংস্কৃতির (Korean Culture) প্রতি অন্ধ ভালোবাসা এবং বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নতাই কি কেড়ে নিল তিনটি তাজা প্রাণ? ১০ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে তিন বোনের আত্মহত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা দেশে।
ঘটনার বিবরণ: পুলিশ সূত্রে খবর, মৃত তিন কিশোরীর বয়স যথাক্রমে ১২, ১৪ এবং ১৬ বছর। মঙ্গলবার গভীর রাতে গাজিয়াবাদের ওই আবাসনের ১০ তলার ফ্ল্যাটের জানলা থেকে তারা একসঙ্গে নিচে ঝাঁপ দেয়। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, তিন বোনই কোরিয়ান পপ গান (K-Pop) এবং ড্রামার (K-Drama) প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত ছিল।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বন্দি জীবন: তিন বোনের বাবা চেতন কুমার পুলিশকে জানিয়েছেন, কোভিডের পর থেকেই মেয়েদের স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা বাড়িতেই থাকত এবং বাইরের জগতের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। নেই কোনো বন্ধু-বান্ধবও। সারাদিন তারা মোবাইলে কোরিয়ান সিনেমা, গান এবং কার্টুন দেখেই সময় কাটাত। এমনকি তারা একটি ইউটিউব চ্যানেলও খুলেছিল, যেখানে কোরিয়ান ড্রামা এবং কার্টুন চরিত্র নিয়ে ভিডিও আপলোড করত। চ্যানেলটিতে ২ হাজার ফলোয়ারও ছিল।
বাবার সঙ্গে সংঘাত ও ‘কোরিয়া’ স্বপ্ন: পরিবার সূত্রে খবর, তিন বোনই দক্ষিণ কোরিয়ায় (South Korea) গিয়ে থাকার স্বপ্ন দেখত। তারা নিজেকে ওই সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করত। বাবা চেতন কুমার বলেন, “ওরা আমাকে বারবার কোরিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা বলত। আমি বুঝিয়েছিলাম যে আমরা ভারতীয়, ভারতেই থাকব। কিন্তু ওরা মানতে চাইত না।” এই আসক্তি কমাতে বাবা তাদের মোবাইল কেড়ে নিয়েছিলেন, এমনকি ফোন বিক্রিও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর মায়ের ফোন ব্যবহার করে তারা ফের সেই ভার্চুয়াল জগতেই ডুবে যায়।
অভিশপ্ত সেই রাত: ঘটনার রাতেও (মঙ্গলবার) খাবার টেবিলে বাবার সঙ্গে মেয়েদের কোরিয়া যাওয়া নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এরপর তারা মায়ের ফোন নিয়ে নিজেদের ঘরে চলে যায়। রাত ২টো নাগাদ তারা ফ্ল্যাটের পুজো ঘরে ঢোকে এবং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। সেখান থেকেই ১০ তলার জানলা দিয়ে মরণঝাঁপ দেয় তিন বোন।
তদন্ত ও সুইসাইড নোট: পুলিশ ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে, যা বাবার উদ্দেশে লেখা। চেতন কুমার পেশায় একজন স্টক ব্যবসায়ী এবং বাজারে তাঁর ৩০ লক্ষ টাকার ঋণ রয়েছে। তবে তিনি অভাবের কারণে আত্মহত্যার তত্ত্ব মানতে নারাজ। পুলিশ কিশোরীদের ব্যবহার করা মোবাইল ফোনগুলি খতিয়ে দেখছে এবং ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে।
মনোবিদদের সতর্কতা: এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল শিশুদের ওপর অনলাইন দুনিয়ার প্রভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে। মনোবিদদের মতে, বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অতিরিক্ত ভার্চুয়াল আসক্তি বা ‘এসকেপিজম’ (Escapism) টিনএজারদের অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
