লোকসভা নির্বাচনের আবহে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন চরমে, ঠিক তখনই তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) -এর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। শুধু রাজনৈতিক মহলই নয়, এই মন্তব্যের জেরে এবার সরাসরি কলকাতা (Kolkata) হাইকোর্টের তোপের মুখে পড়লেন এই দাপুটে যুবনেতা।
‘৪ তারিখে দিল্লির কোন বাবা বাঁচাবে’, একটি জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) এবং বিজেপি নেতৃত্বকে নিশানা করে এমনই তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছিলেন তিনি। আর এই মন্তব্যকেই চূড়ান্ত ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যা দিয়ে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করলেন বিচারপতি।আদালত কক্ষে এই মামলার শুনানির সময় বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি এবং বড় মাপের রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে এই ধরনের মন্তব্য একেবারেই শোভা পায় না।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণে উঠে আসে যে, বাকস্বাধীনতা মানেই যা খুশি বলার অধিকার নয়, বিশেষ করে যখন সেই কথা দেশের বা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক তরজা বা আক্রমণ নতুন কিছু নয়, ভারত (India) -এর মতো বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক পারদ চড়বেই। কিন্তু সেই আক্রমণের একটি নির্দিষ্ট ভাষাগত সীমারেখা থাকা উচিত বলে মনে করছে হাইকোর্ট।প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) -এ শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির মধ্যে সংঘাত দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে নয়াদিল্লি (New Delhi) -র কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ইডি-সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির অতিসক্রিয়তা নিয়ে বারবার সরব হয়েছে ঘাসফুল শিবির।
অভিষেকের এই বিতর্কিত মন্তব্যের প্রেক্ষাপটও ছিল সেই কেন্দ্রীয় বঞ্চনা এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা। ৪ তারিখ, অর্থাৎ লোকসভা ভোটের ফলপ্রকাশের দিনকে ইঙ্গিত করেই তিনি ওই হুঙ্কার দিয়েছিলেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁর কথায় স্পষ্টতই একটা হুঁশিয়ারির সুর ছিল, যা রাজনৈতিক ময়দানে হাততালি কুড়োলেও, আইনের চোখে তা যথেষ্ট আপত্তিকর বলে বিবেচিত হয়েছে।বিজেপি নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছে। তাদের দাবি, তৃণমূল নেতারা নিজেদের পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছেন বুঝতে পেরেই এই ধরনের কুরুচিকর এবং অগণতান্ত্রিক ভাষায় আক্রমণ করছেন।
বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এই ধরনের মন্তব্য আসলে সাধারণ ভোটারদের মনে ভয় দেখানোর একটি নির্লজ্জ চেষ্টা। অন্যদিকে, তৃণমূল শিবিরের একাংশের দাবি, অভিষেক সাধারণ মানুষের আবেগের কথাই তুলে ধরেছেন, সেখানে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে আঘাত করার বা শিষ্টাচার লঙ্ঘন করার কোনও উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না।তবে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের স্বপক্ষে যাই বলুক না কেন, আদালতের এই কড়া অবস্থান নিঃসন্দেহে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
বিচারপতি তাঁর পর্যবেক্ষণে আরও জানান যে, সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের আদর্শ হিসেবে মেনে চলেন। তাই জনসমক্ষে এমন কোনও কথা বলা উচিত নয় যা সমাজের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়। এই ধরণের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক শিষ্টাচারকেই লঙ্ঘন করে না, বরং দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতিও এক ধরণের অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।


Recent Comments