নিজস্ব সংবাদদাতা: বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হওয়ার পর এবার প্রশাসনিক কাঠামোকেও আরও শক্তিশালী করল বিজেপি সরকার। সোমবার কলকাতার লোক ভবনে রাজকীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্যের মন্ত্রিসভার বড়সড় সম্প্রসারণ সম্পন্ন হল। রাজ্যপাল আরএন রবির উপস্থিতিতে শপথ নিলেন ৩৫ জন নতুন মন্ত্রী। অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকেই ছিল রাজনৈতিক মহলের কড়া নজর এবং উৎসাহ।
‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি ও জাতীয় সঙ্গীতের আবহে শুরু হওয়া শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান যেন একদিকে প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে নতুন সরকারের শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, পাশাপাশি রাজ্যের শীর্ষ আমলা, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বহু নতুন মন্ত্রী ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আসায় লোক ভবনের অন্দরেও ধরা পড়ে এক অন্যরকম বাঙালিয়ানা।
প্রসঙ্গত, গত ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মাত্র পাঁচজন মন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অগ্নিমিত্রা পাল, দিলীপ ঘোষ, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডুদের নিয়ে শুরু হয়েছিল নতুন সরকারের প্রথম অধ্যায়। সেই সময় থেকেই মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ নিয়ে জল্পনা চলছিল। অবশেষে সোমবার সেই জল্পনার অবসান ঘটল।
এই সম্প্রসারণের পর রাজ্যের মন্ত্রিসভার মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়াল ৪১। রাজনৈতিক মহলের মতে, এবার শুধু অভিজ্ঞতার উপর নয়, বরং আঞ্চলিক ভারসাম্য, সংগঠনের প্রতি আনুগত্য এবং বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিত্বকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল, শহর কলকাতা থেকে সীমান্তবর্তী জেলা— প্রায় সব প্রান্ত থেকেই জায়গা পেয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।
নতুন মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ফালাকাটার দীপক বর্মন, মানিকতলার তাপস রায়, শিলিগুড়ির ড. শঙ্কর ঘোষ, কুমারগ্রামের মনোজ কুমার ওঁরাও, নোয়াপাড়ার অর্জুন সিং, মুর্শিদাবাদের গৌরীশঙ্কর ঘোষ, রাসবিহারীর স্বপন দাশগুপ্ত, সিউড়ির জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, খড়দহের কল্যাণ চক্রবর্তী, কুলটির অজয় পোদ্দার, বিধাননগরের শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, ময়ূরেশ্বরের দুধকুমার মণ্ডল এবং কাঁথি দক্ষিণের অরূপ কুমার দাস।
স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বেহালা পশ্চিমের ড. ইন্দ্রনীল খাঁ, তুফানগঞ্জের মালতী রাভা রায় এবং গোপীবল্লভপুরের রাজেশ মাহাতো। প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সাংগঠনিক সক্রিয়তার ভিত্তিতেই তাঁদের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।
এছাড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জায়গা পেয়েছেন হবিবপুরের জুয়েল মুর্মু, তমলুকের হরেকৃষ্ণ বেরা, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির আনন্দময় বর্মন, ময়নার অশোক দিন্দা, পারার নাদিয়ার চাঁদ বাউড়ি, কালচিনির বিশাল লামা, ভগবানপুরের শান্তনু প্রামাণিক, বর্ধমান দক্ষিণের মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র, হাওড়া উত্তরের উমেশ রায়, শ্যামপুকুরের পূর্ণিমা চক্রবর্তী, রায়গঞ্জের কৌশিক চৌধুরী, শ্রীরামপুরের ভাস্কর ভট্টাচার্য, সোনামুখীর দিবাকর ঘরামি, নয়াগ্রামের অমিয় কিস্কু, আউশগ্রামের কলিতা মাজি, কান্দির গার্গী দাস ঘোষ, করণদিঘির বিরাজ বিশ্বাস, কাকদ্বীপের দীপঙ্কর জানা এবং বলাগড়ের সুমনা সরকার।
তবে এখনও সবচেয়ে বড় কৌতূহল ঘিরে রয়েছে দফতর বণ্টনকে কেন্দ্র করে। শপথগ্রহণের পর নতুন মন্ত্রীরা নবান্নে যান এবং বিকেলের বিশেষ বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের হাতে কোন মন্ত্রক যাবে, তা চূড়ান্ত করবেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিজেপি সরকার স্পষ্ট বার্তা দিল— শুধু ক্ষমতায় আসাই নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ভিত গড়তেই এবার বড় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নতুন মুখ, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং সাংগঠনিক সমীকরণ— সব মিলিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভা এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়।


Recent Comments