একটা কথা মাঝে মাঝে মনে হয় — রবীন্দ্রনাথ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি কী করতেন? হয়তো চুপ করে বসে থাকতেন শান্তিনিকেতনের সেই আম্রকুঞ্জে, চোখ বন্ধ করে। হয়তো কলম তুলে নিতেন। হয়তো কাঁদতেন — নীরবে, গভীরভাবে — সেই কান্না যা শুধু তারাই কাঁদতে পারেন যিনি একটি স্বপ্নকে ভেঙে যেতে দেখেন নিজের চোখের সামনে।
কারণ তিনি যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে ভারত আজ আর নেই। অথবা হয়তো ছিলই না কখনো — শুধু ছিল একটা সম্ভাবনা, একটা আকাঙ্ক্ষা, একটা প্রার্থনা।
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি…”
এই কবিতার লাইনগুলো আমরা ছোটবেলায় মুখস্থ করেছিলাম। পরীক্ষায় লিখেছিলাম। কিন্তু কতটুকু বুঝেছিলাম? আর আজ যখন বুঝতে পারছি — তখন দেখছি, রবীন্দ্রনাথ যে দেওয়ালগুলো ভাঙার কথা বলেছিলেন, সেগুলো আরো উঁচু হয়ে উঠছে। ইট দিয়ে নয়, ঘৃণা দিয়ে তৈরি সেই দেওয়াল।
রবীন্দ্রনাথের ধর্মনিরপেক্ষতা — পশ্চিমের ধারণার বাইরে
আমরা যখন “সেকুলারিজম” বা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলি, সাধারণত মনে পড়ে ফ্রান্সের “লাইসিতে” — রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার সেই ঠান্ডা, আইনি ব্যবস্থা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই ধারণাটাকে মানতেন না।
তিনি বলতেন, ধর্মকে বাদ দিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না। আধ্যাত্মিকতা মানুষের অন্তর্নিহিত স্বভাব। সেটাকে জোর করে দমন করলে সে ভিতরে ভিতরে গেঁজে ওঠে, একদিন হিংসার আগুন হয়ে বের হয়। তাঁর ভয়টা ছিল সেখানেই।
তাঁর কাছে সেকুলারিজমের মানে ছিল — ধর্মকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং সব ধর্মের মধ্যে যে অভিন্ন মানবিক সত্য আছে, তাকে খুঁজে বের করা। উপনিষদের অদ্বৈত দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রতিটি মানুষের ভিতরেই ব্রহ্মের অস্তিত্ব আছে। তাহলে অন্যকে ঘৃণা করা মানে তো নিজেকেই ঘৃণা করা।
অমর্ত্য সেন তাঁর ‘The Argumentative Indian’ বইয়ে এই চিন্তাকে বলেছেন “Spiritual Humanism” — আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ। রবীন্দ্রনাথের ধর্মচেতনা মানুষকে বিভক্ত করেনি, একত্রিত করেছিল।
তিনি The Religion of Man গ্রন্থে অক্সফোর্ডে হিব্বার্ট বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলেন —
“Bigotry tries to keep truth safe in its hand with a grip that kills it.”
কী গভীর কথা। গোঁড়ামি সত্যকে বাঁচাতে গিয়ে আসলে সত্যকে হত্যা করে। কারণ সত্য কখনো বন্দী থাকে না — সে বাতাসের মতো, যত আটকানোর চেষ্টা করো, তত বের হয়ে যায়। আর যে গোঁড়ামি তাকে আটকায়, সেটা নিজেই একটা মিথ্যার পিঞ্জর হয়ে যায়।
১৯১৬ সাল। বিশ্বজুড়ে জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা। ইউরোপে মহাযুদ্ধ চলছে। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ জাপান আর আমেরিকায় বক্তৃতা দিতে গেলেন — এবং বললেন সেই কথা যা সবাই শুনতে চায় না।
তিনি বললেন, জাতীয়তাবাদ একটি রোগ। একটি বিপজ্জনক রোগ।
“Nationalism is a great menace. It is the particular thing which for years has been at the bottom of India’s troubles.”
এই কথা বলতে সাহস লাগে। প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে, দেশপ্রেমের ঢেউয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলা — জাতীয়তাবাদ বিপদজনক। অনেকে তাঁকে ভুল বুঝেছিলেন।
তিনি “সমাজ” আর “রাষ্ট্র”র মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন। সমাজ হলো প্রাণবন্ত — মানুষ নিজেদের ভালোবাসা আর পারস্পরিক সহযোগিতায় যা তৈরি করে। কিন্তু রাষ্ট্র? রাষ্ট্র হলো একটি যন্ত্র — ক্ষমতার যন্ত্র, স্বার্থের যন্ত্র। আর যখন এই যন্ত্র ধর্মের পোশাক পরে, তখন সে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
“ঘরে বাইরে” উপন্যাসে তিনি এই দ্বন্দ্বকে অপূর্বভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সন্দীপ — উত্তেজনাময়, বাগ্মী, দেশপ্রেমের আগুনে জ্বলন্ত। নিখিল — শান্ত, বিবেকবান, মানবতার পক্ষে নীরব কিন্তু অটল। বিমলা — মাঝখানে দুলতে থাকা এক নারী, যে প্রথমে সন্দীপের আবেগে ভেসে যায়, পরে বোঝে সে আসলে কতটা ফাঁকা।
নিখিলের মুখে রবীন্দ্রনাথ বলিয়েছেন সেই কালজয়ী কথাটা —
“আমি দেশের সেবা করতে রাজি আছি, কিন্তু দেশকে ভগবান বলে পূজা করব না। দেশকে ঈশ্বরজ্ঞানে পূজা করা মানে দেশের উপর অভিশাপ ডেকে আনা।”
আজকের ভারতে এই কথাটা পড়লে বুকের ভেতরে কেমন একটা চিনচিনে ব্যথা হয়। ১৯০৫ সাল। লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করলেন। অফিসিয়াল কারণ — প্রশাসনিক সুবিধা। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল “ভাগ করো, শাসন করো।” মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ — এই বিভাজন রেখে সাম্প্রদায়িক আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া।
রবীন্দ্রনাথ কী করলেন?
তিনি বন্দুক তুললেন না। হিংসার ডাক দিলেন না। তিনি একটি সুতো তুললেন।
১৬ই অক্টোবর, ১৯০৫ — বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন — তিনি কলকাতার রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন রাখিবন্ধনের থালা নিয়ে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার হাতে রাখি বেঁধে দিলেন। নাখোদা মসজিদে গিয়ে মুসলিম আলেমদের হাতে রাখি পরিয়ে দিলেন।
এটা শুধু একটা প্রতীকী অনুষ্ঠান ছিল না। এটা ছিল রবীন্দ্রনাথের দর্শনের বাস্তব রূপ — সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিকতা দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা।
সেই একই দিনে তিনি গাইলেন — “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।” বাংলার পরিচয় কোনো ধর্মে নয়, ভাষায় — মাটিতে — মানুষে। এই গানটাই পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের এই পদক্ষেপ ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা — যখন একজন কবি তাঁর কবিতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছিলেন, কিন্তু সেই হাতিয়ার ছিল ঘৃণার বিরুদ্ধে — ভালোবাসার পক্ষে।
১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হলো। রবীন্দ্রনাথ তার আদর্শ ব্যাখ্যা করলেন একটি উপনিষদীয় বাক্যে —
“যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্” — যেখানে বিশ্ব একটাই নীড় হয়ে ওঠে।
এটা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। এটা ছিল রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের মূর্ত প্রকাশ। এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব ধর্মের পাঠ্যক্রম ছিল। জাতিভেদ ছিল না। নারীদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার ছিল। ভারতীয় দর্শনের পাশাপাশি চীনা, ইসলামিক, পাশ্চাত্য ঐতিহ্য পড়ানো হতো।
তিনি বলেছিলেন —
“Visva-Bharati represents India where she has her wealth of mind which is for all. Visva-Bharati acknowledges India’s obligation to offer to others the hospitality of her best culture and India’s right to accept from others their best.”
এই কথাটায় কত বড় একটা সত্য লুকিয়ে আছে। ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব এই নয় যে সে অন্যদের থেকে আলাদা। ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব এই যে সে সবাইকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে।
“চণ্ডালিকা” নাটকটা পড়লে বুকটা ভারী হয়ে যায়। একটি মেয়ে — প্রকৃতি। সে অস্পৃশ্য। তার সমাজে কোনো মূল্য নেই। একদিন একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তার কাছে জল চাইলেন — কোনো জাতিভেদ না মেনে, শুধু মানুষ হিসেবে। আর সেই একটা ঘটনায় প্রকৃতির ভেতরে জেগে উঠল আত্মসম্মান। জেগে উঠল মানবিক অধিকারের বোধ।
রবীন্দ্রনাথ বলতে চাইলেন — জাতিভেদ শুধু সামাজিক অত্যাচার নয়, এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খল। আর সেই শৃঙ্খল ভাঙতে হলে বাইরের বিপ্লবের আগে দরকার ভেতরের জাগরণ।
১৯৩৪ সালে বিহারে ভয়াবহ ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষ মারা গেলেন। মহাত্মা গান্ধী বললেন — এটা ঈশ্বরের শাস্তি, অস্পৃশ্যতার পাপের প্রায়শ্চিত্ত।
রবীন্দ্রনাথ রুখে দাঁড়ালেন। তিনি গান্ধীজির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্তু এখানে তিনি নীরব থাকতে পারলেন না। তিনি লিখলেন —
“এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের দেশের মানুষ সহজেই মেনে নেয়, এটা ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক… প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে নৈতিক বিধান মেলানো উচিত নয়।”
দুজন মহামানব — দুটো দৃষ্টিভঙ্গি। গান্ধী ধর্মের মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কার করতে চাইলেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন সেই পথে গেলে আসলে সেই ধর্মীয় কাঠামোকেই বৈধতা দেওয়া হয় যা জাতিভেদকে টিকিয়ে রেখেছে।
এই বিতর্ক আজকের দিনে দাঁড়িয়েও প্রাসঙ্গিক।
আজকের ভারত — রবীন্দ্রনাথের আয়নায় একটি ভাঙা ছবি
এখন একটু থামি। একটু ভাবি।
রবীন্দ্রনাথ যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন — সেখানে ধর্ম মানুষকে জোড়া দেয়, আলাদা করে না। সেখানে জাতিপরিচয় মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে না। সেখানে ভাষার বৈচিত্র্য সম্পদ, বোঝা নয়।
২০২৩ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা ছিল ৬৬৮টি। ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে হলো ১,১৬৫টি — মাত্র এক বছরে ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৫ সালে আরো বেড়ে ১,৩১৮টি। এই তথ্য Center for the Study of Organized Hate-এর।
এগুলো শুধু সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটা মানুষ আছে। একটা পরিবার আছে। একটা ভয় আছে।
“বুলডোজার জাস্টিস” — এই বিচিত্র নামটা কীভাবে যেন আমাদের শব্দকোষে ঢুকে গেছে। সাম্প্রদায়িক ঘটনার পর মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভেঙে দেওয়া। বিনা বিচারে, বিনা নোটিশে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালে এতে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে।
মণিপুরে ২০২৩ সাল থেকে চলছে এক ভয়াবহ জাতিগত সংঘাত। মেইতেই আর কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে। ২৫০-এরও বেশি মৃত্যু। ৬০,০০০-এর বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। রাষ্ট্র নীরব দর্শক।
উত্তরপ্রদেশে একটি ১৫ বছরের দলিত ছেলেকে জোর করে মূত্র পান করানো হয়েছে — কারণ সে উঁচু জাতের কেউ। ২০২৪ সালের ঘটনা।
তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র — হিন্দি আরোপণের বিরুদ্ধে আন্দোলন জ্বলছে। কারণ মানুষ অনুভব করছে, তাদের ভাষা, তাদের পরিচয় মুছে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ ১৯০৮ সালে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন —
“Patriotism can’t be our final spiritual shelter… I will never allow patriotism to triumph over humanity as long as I live.”
এই কথাটা আজ কতটা প্রাসঙ্গিক। দেশপ্রেমের নামে মানবতাকে বিসর্জন দেওয়া — এটাই তো রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন।
সন্দীপের উত্তরাধিকার
“ঘরে বাইরে”-র সন্দীপ চরিত্রটা নিয়ে একটু ভাবা দরকার। সে কিন্তু মন্দ মানুষ নয় সহজ অর্থে। সে উত্তেজক, সে আবেগী, সে দেশকে ভালোবাসে — অন্তত নিজে মনে করে ভালোবাসে। তার বক্তৃতায় মানুষ মুগ্ধ হয়। বিমলার মতো বুদ্ধিমতী নারীও তার আকর্ষণে ভেসে যায়।
কিন্তু সন্দীপের দেশপ্রেমে মানবতার জায়গা নেই। তার রাজনীতিতে মুসলিম ব্যবসায়ীদের বয়কটের স্থান আছে। তার আন্দোলনে ধর্মীয় বিভাজনকে ব্যবহার করার কৌশল আছে।
অমর্ত্য সেন বলেছেন — এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। Identity politics বা পরিচয়ের রাজনীতি মানুষকে একটিমাত্র পরিচয়ে সংকুচিত করে দেয়। একজন মানুষ শুধু হিন্দু নন, বা শুধু মুসলমান নন — তিনি একজন মা, একজন কৃষক, একজন শিক্ষক, একজন প্রেমিক, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। কিন্তু রাজনীতি সেই জটিল মানুষটিকে একটা ট্যাগে বেঁধে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ এই সত্যটা একশো বছর আগে বুঝেছিলেন।
ডিজিটাল যুগে “সংকীর্ণ গৃহের প্রাচীর”
রবীন্দ্রনাথের “সংকীর্ণ গৃহের প্রাচীর” আজ শুধু ইটের দেওয়াল নয়। সে দেওয়াল তৈরি হচ্ছে ফেসবুক পোস্টে, হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ডে, ইউটিউব ভিডিওতে। ঘৃণার বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে কোটি কোটি মানুষের কাছে মুহূর্তের মধ্যে।
Center for the Study of Organized Hate জানাচ্ছে — ৯৮ শতাংশ live-streamed ঘৃণামূলক বক্তব্য Facebook আর YouTube চেক করে না। সেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে নিরুপদ্রবে।
মণিপুরের যন্ত্রণা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা মিম হয়ে যায়। দলিত নারীর উপর অত্যাচার একটা ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ হয়। আর তারপর ভুলে যাওয়া হয়।
রবীন্দ্রনাথ ১৯১৭ সালে বলেছিলেন — জাতীয়তাবাদ মানুষকে তাদের নিজেদের নৈতিক পতন সম্পর্কে অচেতন রেখে স্বার্থপরতার কাজ করিয়ে নেয়। আজকের “ডিজিটাল জাতীয়তাবাদ” ঠিক এই কাজই করছে। হ্যাশট্যাগ জাতীয়তাবাদ। মিম দেশপ্রেম। কিন্তু হতাশ হলে চলবে না।
রবীন্দ্রনাথ নিজেও কখনো হতাশ হননি — অন্তত দীর্ঘমেয়াদে। তিনি জানতেন পরিবর্তন ধীরে আসে। তিনি জানতেন সত্যকে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু মারা যায় না।
১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তাঁর নাইটহুড সম্মান ব্রিটিশ সরকারকে ফিরিয়ে দিলেন। লর্ড চেমসফোর্ডকে লিখলেন —
“The time has come when badges of honour make our shame glaring in their incongruous context of humiliation, and I for my part wish to stand, shorn of all special distinctions, by the side of those of my countrymen who for their so-called insignificance are liable to suffer a degradation not fit for human beings.”
এই ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যখন লাখো মানুষ চুপ করে থাকে, তিনি কথা বলতেন। যখন সম্মান আর নিরাপত্তার মধ্যে বেছে নেওয়ার সময় আসত, তিনি নিরাপত্তা ছেড়ে সত্যের পাশে দাঁড়াতেন।
আজ এই চেতনাটা সবচেয়ে বেশি দরকার।
যে শিক্ষক জাতিভেদের বিরুদ্ধে কথা বলেন ক্লাসে — তিনি রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি। যে সাংবাদিক ভয়ের মধ্যেও সত্য খবর লেখেন — তিনি রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি। যে সাধারণ মানুষ পাড়ার মসজিদ পাহারা দেয় রাতে, যে হিন্দু প্রতিবেশীর বিপদে মুসলিম বন্ধু পাশে দাঁড়ায় — তাঁরাই আজকের বিশ্বভারতী।
রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন —
“যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে উচ্ছ্বসিয়া উঠে / যেথা নির্বারিত স্রোতে দেশে দেশে দিশে দিশে / কর্মধারা ধায় আজি বহু বিধ ঋতু বেশে…”
মানুষের ভেতরের কথা যদি স্বাধীনভাবে বেরোতে পারে — ভয় ছাড়া, ঘৃণা ছাড়া — তাহলে সত্যিকারের সমাজ তৈরি হয়।
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির / জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর / আপন প্রাঙ্গণতলে দিবস শর্বরী / বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি…”
এই কবিতাটা শুধু একটি কবিতা নয়। এটা একটা প্রার্থনা। এটা একটা চ্যালেঞ্জ। এটা একটা দর্পণ, যাতে আমরা দেখতে পাই আমরা কোথায় আছি আর কোথায় থাকতে চাই।
রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন — ভারত শুধু একটি দেশ নয়, একটি প্রশ্ন। একটি চিরন্তন প্রশ্ন — বিভিন্ন মানুষ কীভাবে একসাথে বাঁচতে পারে, একে অপরের ভিন্নতাকে সম্মান করতে করতে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো খোঁজা চলছে। আর রবীন্দ্রনাথের উত্তর ছিল — এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে বন্ধ মুষ্টিতে নয়, খোলা হৃদয়ে।
আজ, যখন চারদিকে দেওয়াল উঠছে — ধর্মের দেওয়াল, জাতের দেওয়াল, ভাষার দেওয়াল — তখন রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো শুধু সাহিত্যিক উদ্ধৃতি নয়, এগুলো জীবনধারণের মন্ত্র।
কবি চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর প্রার্থনাটা রয়ে গেছে। সেই প্রার্থনাটা সম্পূর্ণ হবে কি না — সেটা নির্ভর করছে আমাদের উপর।
প্রতিটি মানুষের উপর যে এখনো বিশ্বাস করে যে ভালোবাসা ঘৃণার চেয়ে শক্তিশালী। যে বিশ্বাস করে একটি সুতো দিয়েও ইতিহাস বদলানো যায়।

Recent Comments