শনিবার রাতের ঝকমকে ওয়াশিংটন শহর। বিলাসবহুল ওয়াশিংটন হিলটন (Washington Hilton) হোটেলের বলরুমে বার্ষিক হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনার (White House Correspondents’ Dinner) উপলক্ষে হাজির হয়েছিলেন প্রায় ২৬০০ অতিথি। আমেরিকার নামীদামী সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং তারকাদের এই মিলনমেলায় উপস্থিত ছিলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump), ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প (Melania Trump) এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance)। উৎসবের আমেজ আর হাসিখুশি আড্ডায় মুখর সন্ধ্যাটি মুহূর্তের মধ্যেই পরিণত হলো এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। মেটাল ডিটেক্টর চেকপয়েন্টের ঠিক বাইরে হঠাৎ করেই শোনা গেল গুলির শব্দ। আর তারপরই শুরু হলো চরম বিশৃঙ্খলা এবং প্রাণ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা।
রাত আনুমানিক ৮টা বেজে ৩৬ মিনিট। বলরুমে তখন অতিথিদের রাতের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে মূল প্রবেশপথের কাছে কয়েকটি ভারী শব্দ শোনা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী এবং সাংবাদিকদের মতে, প্রথমটায় অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো কোনো ওয়েটারের হাত থেকে ভারী খাবারের ট্রে মেঝেতে পড়ে গেছে। খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও প্রথমে এমনটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। বলরুমের দরজা সজোরে খুলে যায় এবং নিরাপত্তারক্ষীদের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়।
নিরাপত্তায় নিয়োজিত সিক্রেট সার্ভিস কর্মীরা বিদ্যুৎগতিতে মঞ্চের দিকে ছুটে যান। তারা প্রেসিডেন্ট এবং ফার্স্ট লেডিকে দ্রুত নিচু হতে বলেন। স্যুট এবং দামি গাউন পরা অভিজাত অতিথিরা আতঙ্কে টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রাম্পকে ঘিরে ফেলেন সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (Marco Rubio), হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েইন মুলিন (Markwayne Mullin) এবং হাউস স্পিকার মাইক জনসনকে (Mike Johnson) অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
হামলার ঘটনার পর এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আমি আসলে দেখতে চেয়েছিলাম ওখানে কী ঘটছে। আমি রক্ষীদের কাজটা খুব একটা সহজ করে দিচ্ছিলাম না। আমি বারবার বলছিলাম, ‘একটু দাঁড়ান, আমাকে দেখতে দিন’।” তবে বিপদের মাত্রা বুঝতে পেরে রক্ষীদের কড়া নির্দেশেই তিনি এবং মেলানিয়া মেঝেতে নিচু হয়ে যান। প্রেসিডেন্ট আরও জানান যে, এই ধরনের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও তারা সম্পূর্ণ নিরাপদে আছেন এবং হামলাকারীকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কাবু করার জন্য তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান।
এই হাই-প্রোফাইল হামলার ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া (California) নিবাসী কোল টমাস অ্যালেন (Cole Tomas Allen) নামের এক যুবককে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে একটি শটগান, একটি হ্যান্ডগান এবং একাধিক ছুরি উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই হামলায় এক নিরাপত্তা রক্ষী গুলিবিদ্ধ হলেও, সৌভাগ্যবশত বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরার কারণে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
তবে পুরো দেশজুড়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতি নিয়ে। এত কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ কীভাবে পার হলো এই সশস্ত্র হামলাকারী? তদন্তে জানা গেছে, সন্দেহভাজন এই যুবক আগে থেকেই ওই হোটেলে একটি রুম ভাড়া করে অবস্থান করছিলেন। সাধারণত এই ধরনের হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠানে প্রবেশের জন্য বাইরের স্তরে কড়া তল্লাশি থাকে, কিন্তু অ্যালেন আগে থেকেই হোটেলের অতিথি হওয়ায় তিনি সহজেই ভেতরের অনেকগুলো স্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। এক প্রাক্তন এফবিআই কর্মকর্তার মতে, “হামলাকারী অনুষ্ঠানের রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেয়নি, বরং সে যেদিন হোটেলের রুম বুক করেছিল, সেদিনই সে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পরাস্ত করেছিল। তার শুধু একটি রুমের চাবি দরকার ছিল।”
হামলাকারীর লেখা একটি ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টো থেকে জানা গেছে, সে নিজেই হোটেলের ভেতরে শিথিল নিরাপত্তা দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছিল। সে আশা করেছিল প্রতিটি মোড়ে মোড়ে হয়তো সিসিটিভি এবং চেকিং থাকবে, কিন্তু বাস্তবে তা ছিল না। এই ঘটনার পর বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে সব মহলে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় অনুষ্ঠানে ভিআইপিদের নিরাপত্তার জন্য সুরক্ষার বলয় বা পেরিমিটার আরও প্রসারিত করতে হবে। মেটাল ডিটেক্টরগুলো বলরুমের এত কাছাকাছি না রেখে হোটেলের একেবারে মূল প্রবেশপথেই বসানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

Recent Comments