শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার। তারাপীঠে পুণ্যার্থীদের ভিড়। ভোররাতে যখন অধিকাংশ মানুষ গভীর ঘুমে, তখনই আচমকা ভয়াবহ আগুনে কেঁপে উঠল তারাপীঠের একটি হোটেল। আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ঘুমের মধ্যেই আটকে পড়েন বহু আবাসিক। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে হোটেলের কর্মী এবং পর্যটক—দু’ধরনের মানুষই রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা গিয়েছে, তারাপীঠ থানার কাছেই পুকুরের ধারে অবস্থিত ওই হোটেলে ভোররাতে প্রথম আগুন দেখতে পান হোটেলের কর্মীরা। হোটেলের এক তলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের এনসিবি-তে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিল্ডিংয়ে। হোটেলে থাকা ফাইবারের বিভিন্ন সামগ্রীতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
আগুন লাগার পর হোটেলের ভিতর থেকে চিৎকার ও সাহায্যের জন্য আর্তনাদ শোনা যায়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ ও দমকল বাহিনী। বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর শুরু হয় উদ্ধারকাজ। হোটেলের ভিতর থেকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জনকে উদ্ধার করে রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গিয়েছে।
আগুন এবং ধোঁয়ার কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে। কয়েকজন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন, আবার কয়েকজনের ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে খবর।
হোটেলে থাকা এক পর্যটক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোর ৪টে নাগাদ বিকট শব্দ শুনে ঘুম ভাঙে। বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করতেই দেখতে পান আগুন দ্রুত ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তানও ছিলেন। ঘরে জানলা না থাকায় তাঁরা শৌচালয়ের উপরের ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করেন। প্রায় ৪৫ মিনিট তাঁরা সেখানে আটকে ছিলেন। পরে তারাপীঠ থানার পুলিশ দরজা ভেঙে তাঁদের উদ্ধার করে।
এই ঘটনায় হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিক তদন্তে দমকলের অনুমান, শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে কী কারণে শর্ট সার্কিট হল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হোটেল মালিককে আটক করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে। কোনও রকম গাফিলতি বা অগ্নিবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী। তাঁর কথায়, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এবং হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি যথাযথ ভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
তারাপীঠের মতো গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রে পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে এই অগ্নিকাণ্ড নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে হোটেলগুলিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বেরোনোর পথ এবং নিরাপত্তা বিধি ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি উঠছে।


Recent Comments