বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই ঋতুচক্রের মুকুটহীন সম্রাট হলো বসন্ত (Spring)। বাংলা পঞ্জিকা মতে ফাল্গুন ও চৈত্র (Falgun and Chaitra) এই দুই মাসে মুখরিত হয়ে ওঠে পলাশ রাঙা প্রকৃতি। শহরজুড়ে যখন বাসন্তী রঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে বসন্ত উৎসব (Basanta Utsav) বা দোল যাত্রার (Dol Jatra) প্রস্তুতি চলে জোরকদমে, ঠিক তখনই হিমালয়ের কোলে বসন্ত আসে নিভৃতে , স্নিগ্ধতার মোড়কে মুড়ে। উত্তরবঙ্গে(North Bengal) ঘন পাইনে ঘেরা এমনই এক নির্জন মায়াবী গ্রাম চটকপুর (Chatakpur) যা এই বসন্তের সময়ে হয়ে ওঠে শান্তিপ্রিয় পর্যটক আর ট্রেকারদের (Trekkers) জন্য এক স্বর্গরাজ্য।
বসন্তকে বলা হয় ‘ঋতুরাজ’ (Rituraj), আর পাহাড়ে তার রূপ ভয়ংকর সুন্দর। প্রায় ৭,৮৮৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই ইকো-ভিলেজে বসন্ত আসে এক অদ্ভুত নীরবতা নিয়ে। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে এটি এমন এক জায়গা, যেখানে আপনি নিজের হৃদস্পন্দন নিজেই শুনতে পাবেন।ট্রেকার এবং পর্বতপ্রেমীদের কাছে এই সময়টা সবথেকে প্রিয়। কারণ বসন্তের আকাশ থাকে কাঁচের মতো স্বচ্ছ। শীতের কুয়াশা কেটে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা (Kanchenjunga) তখন তার পূর্ণ মহিমায় ধরা দেয়। যারা পাহাড়ি পথে হাঁটতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য চটকপুর থেকে টাইগার হিল (Tiger Hill) পর্যন্ত ট্রেকিং রুটটি এই সময়ে সবথেকে সুন্দর দেখায়। দুপাশে ফুটে থাকা বুনো অর্কিড আর পাহাড়ি ফুল আপনার ক্লান্তিকে এক নিমেষে দূর করে দেবে।
চটকপুরের (Chatakpur)মূল আকর্ষণ হলো এর কটেজগুলির কাঠের বারান্দা অথবা ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার স্বর্গীয় রূপপরিবর্তন। বসন্তের ভোরের সূর্যোদয়ের দৃশ্য, আপনার মনের মণিকোঠায় বয়ে নিয়ে আসবে এক অপূর্ব সুরের সূরমূচ্ছনা , রবিকিরণের প্রথম আলোয় তুষারাবৃত পাহাড়ের চূড়াগুলো প্রথমে হালকা গোলাপি, তারপর উজ্জ্বল কমলা এবং শেষে খাঁটি সোনার রঙ ধারণ করে। এই দৃশ্য এতটাই মায়াবী যে একে কেবল পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায় ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বসন্তের এই পাহাড়ি আবহাওয়া ও আকাশ দুটিই বেশ মনোরম ও স্বচ্ছ।যারা বার্ড ওয়াচিং (Birdwatching) পছন্দ করেন, তাদের জন্য বসন্তের চটকপুর এক আদর্শ জায়গা। সেনচাল ফরেস্টের গভীরে দেখা মিলতে পারে নানা বিরল প্রজাতির হিমালয়ান পাখির।চটকপুর (Chatakpur) পুরোপুরি একটি জৈব বা অর্গানিক (Organic) গ্রাম। এখানকার মানুষ প্রকৃতিকে ভালোবেসে পর্যটনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। মাটির কাছাকাছি থাকার এমন সুযোগ আধুনিক শহুরে (City) জীবনে মেলা ভার। যারা হাঁটতে ভালোবাসেন, তারা চটকপুরের জঙ্গলের পথ ধরে করতে পারেন একটি রোমাঞ্চকর ট্রেক (Trek) । বসন্তের মিঠে রোদে এই বন্যপথ অতিক্রম করা জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে। তবে বসন্তে আবহাওয়া মনোরম থাকলেও রাতের দিকে তাপমাত্রা বেশ কমে যেতে পারে, বিশেষ করে ৪,০০০ মিটারের উপরের অঞ্চলে হিমাঙ্কের নিচেও নামতে পারে।
বাঙালির কাছে বসন্তের একটা রোমান্টিক আমেজ আছে,এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে প্রেমের কবিতা আর গান। আর সেই গান যদি হয় কাঞ্চনজঙ্ঘার (Kanchenjunga) সামনে বসে, তবে তার আমেজই আলাদা। চটকপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত অতিথিবৎসল। তাদের সাধারণ জীবনযাপন আর পাহাড়কে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই আপনাকে নতুন করে জীবনকে ভালোবাসতে শেখাবে। তাই যদি পাহাড় আর নিস্তব্ধতাকে ভালোবাসেন, তবে এই ফাল্গুন-চৈত্রেই আপনার গন্তব্য হোক উত্তরবঙ্গের লুকানো রত্নটি। একঘেয়ে যান্ত্রিক রূটিনের বাইরে মেঘেদের লুকোচুরি ও স্নিগ্ধ সবুজের মাঝে কাটিয়ে আসতে পারেন এক ভিন্ন স্বাদের বসন্ত।

