দেশের শীর্ষ আদালতে ফের পিছিয়ে গেল আই-প্যাক (I-PAC) মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি। বঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তথা সরকার বদলের পর এই নিয়ে দ্বিতীয় বার স্থগিত হয়ে গেল এই বহুল চর্চিত মামলার আইনি প্রক্রিয়া। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র এবং বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়ার ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। আদালত সূত্রে জানানো হয়েছে, আগামী অগস্ট (August) মাসে এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১০ দিনের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার আই-প্যাক মামলার শুনানি পিছিয়ে গেল। এর আগে গত ১৩ মে শীর্ষ আদালতে মামলাটি ওঠার কথা থাকলেও কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা (Tushar Mehta) সওয়াল করার জন্য কিছুটা অতিরিক্ত সময় চেয়েছিলেন। সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে শুনানির ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন জানানো হলে, আদালত তা মঞ্জুর করে ২২ মে পরবর্তী দিন স্থির করেছিল। কিন্তু শুক্রবারও সেই শুনানির প্রক্রিয়া এগোলো না।
কেন এই মামলা? কী ঘটেছিল অতীতে?
এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত চলতি বছরের শুরুতেই। গত ৮ জানুয়ারি কয়লা পাচার সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্তের সূত্রে আই-প্যাক (I-PAC) সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের (Pratik Jain) বাড়ি এবং প্রধান কার্যালয়ে অতর্কিতে হানা দেয় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি (ED)। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সেই তল্লাশি অভিযান যখন পুরোদমে চলছিল, ঠিক তখনই আকস্মিক ভাবে সেখানে সশরীরে উপস্থিত হন রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)।
কেন্দ্রীয় এজেন্সির অভিযোগ ছিল, ওই অভিযানের সময় তদন্ত প্রক্রিয়ায় চরম বাধা সৃষ্টি করা হয় এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়। এই ‘বেআইনি হস্তক্ষেপে’র অভিযোগ তুলে ইডি (ED) সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) দ্বারস্থ হয় এবং সংবিধানের ৩২ নম্বর ধারা (সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার) অনুযায়ী তৎকালীন শাসক দল তথা রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অন্যদিকে পাল্টা সুর চড়িয়ে রাজ্যের বিদায়ী সরকারের পক্ষ থেকেও সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা হয়। গত ১৫ জানুয়ারি আদালত দুই পক্ষকেই নিজেদের স্বপক্ষে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
পূর্ববর্তী শুনানিতে দেশের শীর্ষ আদালত এই হাই-প্রোফাইল মামলায় তদন্ত চলাকালীন একজন মুখ্যমন্ত্রীর সশরীরে হস্তক্ষেপ করা নিয়ে অত্যন্ত কড়া এবং তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রেখেছিল। শুনানির সময় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিরোধ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়।
তবে সেই যুক্তিতে একেবারেই সন্তুষ্ট হননি বিচারপতি মিশ্র। তিনি কড়া ভাষায় প্রশ্ন তুলে বলেন:
”যদি কোনো প্রভাবশালী মন্ত্রী বা প্রশাসনিক প্রধান হঠাৎ করে একটি চলমান তদন্তের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং সমান্তরাল ভাবে সেটিকে নিজের মতো করে চালাতে চান, আর তার পর আদালতে এসে বলেন যে এটা কেন্দ্র ও রাজ্যের বিরোধ— তবে কি তা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?”
পাল্টা যুক্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনজীবী দাবি করেন, তদন্ত চলাকালীন এমন আকস্মিক হস্তক্ষেপের কারণে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুতর অপরাধ সংক্রান্ত বহু তথ্য ও প্রমাণ নষ্ট বা লোপাট করে দেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
অন্য দিকে, রাজ্যের তৎকালীন শাসক দলের দেওয়া হলফনামায় দাবি করা হয়েছিল যে, আই-প্যাক কর্ণধারের বাসভবন ও দপ্তরে ইডির (ED) এই ধরণের অভিযান ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারায় প্রদত্ত মানুষের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে চরম ভাবে খর্ব করে।
আপাতত মে মাস পেরিয়ে আগামী আগস্ট (August) মাস পর্যন্ত এই হাই-ভোল্টেজ মামলার ভবিষ্যৎ ঝুলেই রইল। রাজনৈতিক মহলের নজর এখন শীর্ষ আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।


Recent Comments