শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে পুরসভা বিগত তৃণমূল (TMC) সরকারের আমলে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। তবে বঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নতুন সরকার গঠনের পর এবার আরও এক চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে এল। এবার খোদ স্কুল পড়ুয়াদের পোশাক তথা ইউনিফর্ম (School Uniform) তৈরিতেও বড়সড় দুর্নীতির হদিশ মিলল। সরকারি স্কুলের ইউনিফর্মে অত্যন্ত নিম্নমানের কাপড় ব্যবহার এবং নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করার অভিযোগে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)।সোমবার (২৫ মে, ২০২৬) নবান্ন (Nabanna) সভাঘরে রাজ্যের উচ্চপদস্থ সচিব পর্যায়ের আধিকারিকদের নিয়ে একটি হাই-প্রোফাইল পর্যালোচনা বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই বৈঠকেই স্কুল ইউনিফর্মের গুণমান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। এই গাফিলতির জন্য রাজ্যের বস্ত্র দপ্তর (Textiles Department) এবং অর্থ দপ্তর (Finance Department)-কে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করার পাশাপাশি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট তলব করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
গুণমান যাচাই ছাড়াই কোটি কোটি টাকার পেমেন্ট! নবান্নে প্রমাণ পেশ শুভেন্দুর
তৎকালীন তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যের সমস্ত সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলিতে পড়ুয়াদের বিনামূল্যে সরকারি পোশাক দেওয়ার প্রকল্প চালু হয়েছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-র নির্দেশে এই পোশাক তৈরির বরাত দেওয়া হয়েছিল রাজ্যের বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে (Self Help Groups)। কিন্তু অভিযোগ, শুরু থেকেই বহু স্কুলে পোশাকের মান অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল, কোথাও আবার সাইজ বা মাপের ব্যাপক গরমিল ছিল। তৎকালীন জমানায় এই নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না হলেও, ক্ষমতা বদলাতেই এবার ফাইল খুলল নবান্ন।এদিনের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) কেবল মৌখিক অভিযোগ করেননি, বরং নিজের বক্তব্যের সপক্ষে একাধিক অকাট্য প্রমাণ আধিকারিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন:”স্কুল ইউনিফর্ম তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট যে সরকারি প্রোটোকল বা গুণমান (Quality) নির্ধারিত ছিল, তা মানা হলো কি না, সেটা সংশ্লিষ্ট বিভাগ খতিয়ে দেখেনি কেন? গুণমান যাচাই করার শংসাপত্র ছাড়াই কীভাবে একের পর এক সংস্থাকে ছাড়পত্র দেওয়া হলো?”এর পরেই অর্থ দপ্তরের আধিকারিকদের কোণঠাসা করে মুখ্যমন্ত্রী জানতে চান, যদি কাপড়ের মান সঠিক না-ই ছিল, তবে কিসের ভিত্তিতে এবং কার নির্দেশে রাজ্যের সরকারি কোষাগার থেকে ওই সমস্ত সংস্থাকে কোটি কোটি টাকার পেমেন্ট (Payment) বা অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া হলো? চাপের মুখে অর্থ দপ্তরের আধিকারিকরা তৎকালীন ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ অর্থাৎ বিদায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে আঙুল তুললেও মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, অর্থ সচিবালয় নিজের আর্থিক নজরদারির দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।
কড়া রিপোর্টের নির্দেশ, শাস্তির মুখে দোষী আধিকারিকরা
নবান্ন সূত্রে খবর, এই অর্থ অপচয় এবং বেআইনি কাজের নেপথ্যে কোন কোন প্রশাসনিক সিন্ডিকেট বা আধিকারিক যুক্ত ছিলেন, তা চিহ্নিত করতে বস্ত্র ও অর্থ দপ্তরকে যৌথভাবে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কার নির্দেশে এই অর্থ রিলিজ করা হয়েছিল, তা রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করতে হবে।মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর কাপড়ের নমুনা পরীক্ষা করা হবে এবং যারা শিশুদের পোশাকের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হবে। বঙ্গে ‘ডবল ইঞ্জিন’ (Double Engine) সরকার আসতেই যে একের পর এক দুর্নীতির রুদ্ধদ্বার ফাইল খুলতে শুরু করেছে, এদিনের বৈঠক তারই বড় প্রমাণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।


Recent Comments