বিধাননগরে শাসকদলের অন্দরে এবার যেন এক মহাপ্রলয় নেমে এল। কয়েকদিন আগেই মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীর (Krishna Chakraborty) ইস্তফা নিয়ে তীব্র শোরগোল পড়েছিল সল্টলেকের রাজনৈতিক অলিন্দে। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার পুলিশের জালে ধরা পড়লেন বিধাননগর পুরনিগমের (Bidhannagar Municipal Corporation) বর্তমান চেয়ারম্যান তথা উত্তর ২৪ পরগনার (North 24 Parganas) দাপুটে তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্ত (Sabyasachi Dutta)। এক কোটি টাকারও বেশি অঙ্কের তোলাবাজি এবং খুনের হুমকির অভিযোগে গভীর রাতে তাঁর রাজারহাটের (Rajarhat) বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে বিধাননগর উত্তর থানার (Bidhannagar North Police Station) পুলিশ।
সোমবার গভীর রাতে রাজারহাটের রাইগাছি (Raigachi) এলাকায় সব্যসাচী বাবুর বহুতল আবাসনটি আচমকাই ঘিরে ফেলে বিশাল পুলিশবাহিনী। দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এই হেভিওয়েট নেতার আচমকা গ্রেপ্তারি পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক মস্ত বড় ধাক্কা বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
কোটি টাকার তোলাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকি
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মধুসূদন চক্রবর্তী (Madhusudan Chakraborty) নামের স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বিধাননগর উত্তর থানায় সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিধাননগরের তৎকালীন মেয়র থাকাকালীন সব্যসাচী দত্ত তাঁর কাছ থেকে জোরপূর্বক ১ কোটি ৫ লাখ টাকা নগদ আদায় করেছিলেন। শুধু তাই নয়, টাকা না দিলে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হবে বলে অনবরত মানসিক নির্যাতন এবং প্রাণনাশের হুমকি (Death Threat) দেওয়া হতো।
দীর্ঘদিন ভয়ে মুখ না খুললেও, সম্প্রতি রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আবহে ওই ব্যবসায়ী সাহস জুটিয়ে থানায় FIR দায়ের করেন। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে এবং কিছু নথিপত্র খতিয়ে দেখে এই তোলাবাজির (Extortion) মামলার সত্যতা মেলার পরেই তাঁরা দ্রুত গ্রেপ্তানির পদক্ষেপ নিয়েছেন।
”সবটাই চক্রান্ত, সাজানো মামলা“
মঙ্গলবার সকালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সল্টলেকের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন সব্যসাচী দত্ত। সেখানে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি সাফ জানান, “আমার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এই সাজানো মামলা (Fabricated Case) তৈরি করা হয়েছে। যে কেউ চাইলে যে কারও নামে অভিযোগ করতে পারে, কিন্তু আমি কোনো টাকা নিইনি।”
দলবদলের ইতিহাস ও বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট
সব্যসাচী দত্ত বিধাননগরের রাজনীতিতে এক অত্যন্ত বর্ণময় ও বিতর্কিত চরিত্র। তিনি দু’বারের বিধায়ক (MLA) হওয়ার পাশাপাশি বিধাননগরের মেয়র হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের পর তিনি তৃণমূল ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি (BJP)-তে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার ঠিক দু’বছর পরেই ফের জোড়াফুলে প্রত্যাবর্তন ঘটে তাঁর। বর্তমানে তিনি ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং পুরনিগমের চেয়ারম্যান পদে আসীন ছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বারাসত (Barasat) কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে লড়লেও বিজেপির কাছে পরাজিত হন তিনি।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গ্রেপ্তারি আদতে শাসকদলের ওপর তৈরি হওয়া চর্তুমুখী চাপের একটি অংশ মাত্র। সুজিত বোসের (Sujit Bose) মতো প্রাক্তন মন্ত্রীর গ্রেপ্তারি, ফলতার দাপুটে নেতা জাহাঙ্গীর খানের (Jahangir Khan) ভারত-নেপাল সীমান্ত থেকে STF-এর হাতে ধরা পড়া, আর এবার সব্যসাচী দত্তের খাঁচাবন্দি হওয়া— সব মিলিয়ে বিধাননগর তথা গোটা দক্ষিণবঙ্গে শাসক শিবিরের পায়ের তলার মাটি যে বেশ নড়বড়ে, এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আপাতত সব্যসাচী বাবুকে নিজেদের হেফাজতে চেয়ে বিধাননগর আদালতে তোলার তোড়জোড় চালাচ্ছে পুলিশ।


Recent Comments