রাজ্য রাজনীতিতে একের পর এক ওলটপালট এবং ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতেই এবার চরম বিপাকে পড়ল শাসক দল । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও এককালের পরম আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত মনোতোষ সাহা ওরফে মন্টু সাহার আইনি চিঠির জেরে মঙ্গলবার রাতে তড়িঘড়ি খালি করে দেওয়া হলো ইএম বাইপাসের ধাবার পিছনের বহুতলটি, যা এতদিন তৃণমূলের অস্থায়ী সদর কার্যালয় বা ‘তৃণমূল ভবন’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল ।
তপসিয়া থেকে মেট্রোপলিটন: সাময়িক ঠিকানার ইতিহাস
গোটা ঘটনার প্রেক্ষাপট ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ের । তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সে সময় তপসিয়ার পুরনো ‘তৃণমূল ভবন’টি ভেঙে সম্পূর্ণ কর্পোরেট কায়দায় এক অত্যাধুনিক বহুতল পার্টি অফিস তৈরির সিদ্ধান্ত নেন । যার ফলে দলের মূল কার্যালয়ের কাজকর্ম সাময়িকভাবে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ।
সেই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কলকাতার এক নামী ডেকোরেটর ব্যবসায়ী তথা দিদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মণ্টু সাহা এগিয়ে আসেন এবং বাইপাস ধাবার পিছনের মেট্রোপলিটন এলাকার নিজের এই বহুতল ভবনটি দলকে ব্যবহার করতে দেন । বিরোধীদের একাংশের দাবি, এক সময় ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে মন্টু সাহার এই অবিশ্বাস্য ব্যবসায়িক সাফল্যের পেছনে সবুজ শিবিরেরই বড় হাত ছিল।
সম্পর্কের ফাটল ও বাড়ি খালি করার কড়া নোটিস
তবে রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পালাবদলের পর থেকেই দল এবং খোদ সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মন্টু সাহার সম্পর্কের ফাটল চওড়া হতে শুরু করে । মে মাসেই তিনি এই বাড়িটি সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়ার জন্য তৃণমূল নেতৃত্বকে দুই মাসের সময়সীমা দিয়ে কড়া আইনি নোটিস ধরান । শুধু তাই নয়, এক সময় তৃণমূলের সমস্ত দলীয় কর্মসূচিতে নিখরচায় চেয়ার, মাইক বা ডেকোরেটিংয়ের জিনিসপত্র সরবরাহ করাও তিনি হঠাৎ বন্ধ করে দেন, যা দল ও তাঁর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্বকে স্পষ্ট করে দিয়েছিল ।
মঙ্গলবার রাতের নাটকীয়তা ও থানায় অভিযোগ
দুই মাস সময় হাতে থাকলেও, রাজনৈতিক মহলের জল্পনা সত্যি করে গত মঙ্গলবার রাতেই তড়িঘড়ি খালি করে দেওয়া হয় তৃণমূলের ওই অস্থায়ী কার্যালয়টি । ভবনের তিন এবং চার তলার ঘরগুলি থেকে সমস্ত আসবাবপত্র বের করে দিয়ে সেখানে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বড় বড় তালা।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে বাড়িওয়ালার পক্ষের এক সদস্য সংবাদমাধ্যমের কাছে অভিযোগের সুরে জানান:
“তৃণমূলের সঙ্গে মূলত দুটি ফ্লোর ব্যবহারের লিখিত চুক্তি ছিল। কিন্তু সেই চুক্তির বাইরে গিয়ে তারা আরও দুটি ফ্লোর জোরপূর্বক ও অবৈধভাবে ব্যবহার করছিল। মঙ্গলবার রাতে সেই দুটি ফ্লোরই মূলত খালি করা হয়েছে।”
ইতিমধ্যেই তালাবন্ধ ওই দুটি ফ্লোর সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করার দাবিতে মালিকপক্ষের তরফে স্থানীয় থানায় একটি ডায়েরিও করা হয়েছে। তবে এই গোটা হাই-প্রোফাইল বিতর্ক নিয়ে আপাতত সম্পূর্ণ ‘স্পিকটি নট’ বা মৌনব্রত অবলম্বন করেছেন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী মনোতোষ সাহা। একদিকে তপসিয়ার মূল কার্যালয় তৈরির গতি অত্যন্ত শ্লথ, অন্যদিকে অস্থায়ী অফিসও হাতছাড়া— এই জোড়া চাপে পড়ে তৃণমূল শিবির বর্তমানে তীব্র দিশেহারা।


Recent Comments