লোকসভা নির্বাচনের (Lok Sabha Election) দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে শহরের দৈনন্দিন ছন্দে বড়সড় ব্যাঘাত ঘটেছে। নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে বিধানসভা বা লোকসভা—যেকোনো বড় নির্বাচনের প্রস্তুতিতেই রাস্তায় নামে বিপুল সংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি যান। এবারও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। ভারত (India) বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, আর এই গণতন্ত্রের মহোৎসবে শামিল হতে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে সাময়িক প্রভাব পড়ে, তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) রাজ্যের রাজধানী কলকাতা (Kolkata) এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতে গত কয়েকদিন ধরে তীব্র যানজট ও গণপরিবহণের চূড়ান্ত অভাব দেখা যাচ্ছে।
এর ফলে সাধারণ নিত্যযাত্রী থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া—সকলেই পড়ছেন চরম সমস্যায়।পরিবহণ সংকট ও পুলকার মালিকদের বক্তব্যবর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে ছোট ছোট স্কুলপড়ুয়ারা। শহরে পুলকার পরিষেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু পরিবারে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। কীভাবে সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠানো যাবে এবং বাড়ি ফিরিয়ে আনা যাবে, তা নিয়ে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। শহরের এক পরিচিত পুলকার সংগঠনের কর্তা বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সোজাসাপটা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতি বর্তমানে এমন এক জটিল জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে রাস্তায় গাড়ি নামানোই রীতিমতো ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন রুটে গাড়ির চাহিদা এবং প্রশাসনিক নির্দেশিকার কারণে আপাতত পরিষেবা বন্ধ রাখা ছাড়া তাঁদের কাছে আর কোনো দ্বিতীয় বা বিকল্প উপায় নেই। পুলকার মালিকদের এই সিদ্ধান্তে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ ও চিন্তিত অভিভাবক মহল, তবে বাস্তব পরিস্থিতির কাছে সকলেই যেন কিছুটা অসহায়।স্কুলগুলোর বিকল্প পদক্ষেপ: ফিরছে ডিজিটাল ক্লাসরুমএই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শহরের বহু নামী স্কুল কর্তৃপক্ষ আর কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের এই চরম দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে তারা একটি যুগোপযোগী বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। করোনা মহামারীর সময় যে ব্যবস্থাটি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল, সেই অনলাইন পাঠ বা ডিজিটাল ক্লাসরুম আবারও ফিরে আসছে।
আগামী সোমবার থেকেই শহরের একাধিক প্রথম সারির স্কুলে শুরু হচ্ছে অনলাইন ক্লাস।এক স্কুল কর্তৃপক্ষের শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা এবং নিয়মিত পড়াশোনা—এই দুটি বিষয়ই তাদের কাছে সর্বদা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাস্তায় বেরিয়ে স্কুলে আসার ক্ষেত্রে বাচ্চাদের যে শারীরিক ও মানসিক ধকল পোহাতে হবে, তা অনুধাবন করেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুই দিকই মাথায় রেখে, অর্থাৎ পঠনপাঠন যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় এবং ছাত্রছাত্রীরাও যাতে নিরাপদে নিজেদের বাড়িতে থাকতে পারে, সেই কারণেই সোমবার থেকে ফের ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনেই শুরু হবে পঠনপাঠন।
অন্যদিকে ,বাস পরিষেবায় কাটছাঁট ও সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ। শুধু যে পুলকার পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে তা নয়, শহরের বাস পরিষেবাও ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। বেসরকারি বাস মালিকদের দাবি অনুযায়ী, শহরের প্রায় আশি শতাংশ বাস ইতিমধ্যেই নির্বাচনী কাজে চলে যাবে বা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে সাধারণ যাত্রীদের জন্য রাস্তায় খুব কম সংখ্যক গাড়িই অবশিষ্ট থাকবে। অফিসযাত্রী থেকে শুরু করে দিনমজুর—যাঁরা প্রতিদিন বাসের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। দীর্ঘক্ষণ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা এবং বাদুড়ঝোলা হয়ে যাতায়াত করা এখন নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর পাশাপাশি, বাসের ভাড়ার অগ্রিম অংশ নেওয়া নিয়েও মালিক ও চালকপক্ষের মধ্যে ক্ষোভ শোনা যাচ্ছে তাঁদের গলায়।ভোটের কাজে ব্যবহৃত বাসের অগ্রিম ভাড়া নিয়ে ক্ষোভ, প্রশাসনের ‘দ্বিচারিতা’র কড়া সমালোচনা বাস সিন্ডিকেটের সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়েরচলতি লোকসভা নির্বাচনের (Lok Sabha Election) আবহে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) জুড়ে সাজো সাজো রব। গণতন্ত্রের এই বৃহত্তম উৎসবে ভোটকর্মী এবং নিরাপত্তারক্ষীদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অপরিহার্য অঙ্গ হল গণপরিবহণ। আর এই বিপুল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য প্রতিবারের মতোই এবারও রাজ্যজুড়ে প্রচুর সংখ্যক বেসরকারি বাস এবং গাড়ি অধিগ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (Election Commission)। কিন্তু এই গাড়িগুলির ভাড়া এবং চালক-সহকারীদের দৈনিক ভাতা নিয়ে এবার বড়সড় ক্ষোভ দানা বেঁধেছে বাস মালিক ও পরিবহণ শ্রমিকদের মধ্যে। প্রথম দফার নির্বাচন মিটে গেলেও রাজ্যের বহু জেলায় এখনও গাড়ির অগ্রিম টাকা মেলেনি বলে অভিযোগ। আর এই অব্যবস্থা নিয়েই এবার প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেট-এর (Joint Council of Bus Syndicate) সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় (Tapan Banerjee)।
কী কী দাবি রাখছেন তপন বন্দ্যোপাধ্যায়?
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের কাছে তাঁদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলি স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন। সরাসরি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “নির্বাচনের কাজে যে সমস্ত গাড়ি অধিগ্রহণ করা হবে, সাধারণ বা নন-এসি বাসের ক্ষেত্রে তার দৈনিক ভাড়া দিতে হবে সাড়ে ৩ হাজার টাকা এবং এসি বাসের ক্ষেত্রে তা হবে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। এর বাইরে ডিজেলের খরচ প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।”চালক এবং সহকারীদের ভাতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “যে শ্রমিকরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত এক করে এই ভোটের ডিউটি করবেন, তাঁদের খোরাকি বাবদ দৈনিক ৫০০ টাকা করে দিতে হবে।”
অগ্রিম প্রদান নিয়ে প্রশাসনের গাফিলতির কথা তুলে ধরে তপনবাবু স্পষ্টভাবে জানান, “গাড়ি যখন নির্বাচনের কাজে রিপোর্ট করবে, তার আগেই প্রতিটি গাড়িকে মোট ভাড়ার ৭৫ শতাংশ টাকা অগ্রিম (Advance) হিসেবে দিতে হবে। আর বাকি যে ২৫ শতাংশ টাকা পাওনা থাকবে, তা বিল জমা দেওয়ার পনেরো দিনের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে।”প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘দ্বিচারিতা’র গুরুতর অভিযোগবাস মালিকদের ক্ষোভের সবচেয়ে বড় কারণ হল প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবায়নের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ তপন বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি ‘দ্বিচারিতা’র অভিযোগ তুলে বলেন, “নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলার সময় একরকম কথা হয়, আবার নোটিফিকেশন হয় একরকম। আর ভোটের ময়দানে সম্পূর্ণ আলাদা চিত্র দেখা যায়।
কথায় ও কাজে এই দ্বিচারিতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। খাতায়-কলমে ভাড়া এবং খোরাকি মাত্র ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক।”প্রথম দফার ভোট মিটে গেলেও বহু গাড়ির মালিক যে এখনও কানাকড়িও পাননি, সে কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, “হাওড়া (Howrah) এবং হুগলি (Hooghly) জেলায় কিছু মালিক টাকা পেলেও রাজ্যের সিংহভাগ জেলাই বঞ্চিত। মালদহ (Malda), উত্তর দিনাজপুর (Uttar Dinajpur), বালুরঘাট (Balurghat), রায়গঞ্জ (Raiganj), মেদিনীপুর (Medinipur), উত্তর ২৪ পরগনা (North 24 Parganas) থেকে শুরু করে খোদ কলকাতা (Kolkata) শহরের বহু বাস মালিক এখনও ২০২৬ সালের নির্বাচনের এই অগ্রিম টাকা পাননি। পাহাড় থেকে সাগর—আমাদের সংগঠনের সমস্ত সদস্যের প্রতি এই বঞ্চনা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।”
গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের দাবি ও চূড়ান্ত আবেদনভাড়া এবং ভাতার পাশাপাশি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি দাবি তুলে ধরেছেন পরিবহণ শ্রমিকরা। তপনবাবু বলেন, “ভোটের সময় যে শ্রমিকরা গাড়িতে ডিউটি করবেন, তাঁদের পোস্টাল ব্যালটের (Postal Ballot) মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ মানুষ যখন ভোট দিচ্ছেন, তখন এঁরা ডিউটিতে ব্যস্ত থাকেন বলে নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এটা হতে দেওয়া যায় না।”


Recent Comments