নিজস্ব সংবাদদাতা : বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল ও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। সেই আবহেই বিরোধী শিবির হিসেবে কংগ্রেস একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা রাজ্যের ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রথম বড় সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রদেশ কংগ্রেস ঘোষণা করেছে, এবার তারা প্রকাশ্যে শহিদ দিবস পালন করবে শহিদ মিনার চত্বরে। এতদিন ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি মূলত দলীয় কার্যালয়ের মধ্যে বা সীমিত পরিসরে পালিত হলেও এবার কংগ্রেস সরাসরি প্রকাশ্য মঞ্চে বড় আকারে কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। কারণ ২১ জুলাইয়ের দিনটি দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কংগ্রেসের প্রকাশ্য কর্মসূচিকে রাজনৈতিকভাবে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র স্মরণ অনুষ্ঠান নয়, বরং জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটি কৌশলগত চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে যে মঞ্চকে শাসক দল নিজেদের শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে, সেখানে বিরোধী কংগ্রেসের সক্রিয় উপস্থিতি রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে।
একই সময় কংগ্রেসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ সামনে এসেছে—‘ঘর ওয়াপসি’ বা ঘরে ফেরার ডাক। প্রদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব নেতা একসময় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক কারণে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের আবার পুরনো দলে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এই সম্ভাব্য যোগদান প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ যাচাই কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে কারা দলে ফিরতে পারবেন এবং কারা পারবেন না।
কংগ্রেস স্পষ্ট জানিয়েছে, আদর্শগতভাবে দলের সঙ্গে যুক্ত এবং অতীতে দলের হয়ে কাজ করা নেতাদেরই মূলত স্বাগত জানানো হবে। তবে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা বিতর্কিত ভাবমূর্তির অভিযোগ থাকলে তাদের ক্ষেত্রে আলাদা মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।এই দুই সিদ্ধান্তকে একসঙ্গে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, একদিকে কংগ্রেস যেমন প্রকাশ্য জনসমাবেশ ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রতীকের মঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে, অন্যদিকে সংগঠনের ভেতরে পুরনো শক্তিকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
এদিকে এই পুরো পরিস্থিতির মধ্যে আবারও আলোচনায় এসেছে শাসক দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের পর তৃণমূলের ভেতরে কিছুটা সাংগঠনিক চাপ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগিয়ে বিরোধী কংগ্রেস নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, একদিকে জনসমক্ষে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি, অন্যদিকে দলে পুরনো মুখ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ—এই দুই দিক মিলিয়ে কংগ্রেস রাজ্যের রাজনীতিতে একসঙ্গে প্রতীকী ও সাংগঠনিক দুই স্তরেই চাপ তৈরি করতে চাইছে। ফলে আগামী দিনে এই ‘দুই চালের রাজনীতি’ কতটা বাস্তবে শক্তির ভারসাম্য বদলাতে পারে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

Recent Comments