উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের ভয়াবহ দাবানল এবার সরাসরি ছুঁয়ে গেল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং বিলাসবহুল শহর দুবাই (Dubai)-কে। শনিবার গভীর রাতে দুবাই মেরিনা (Dubai Marina) এলাকার একটি সুউচ্চ ভবনে সজোরে আঘাত হেনেছে ইরান (Iran) থেকে ধেয়ে আসা একটি মিসাইলের জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর ওই গগনচুম্বী অট্টালিকার একাংশ থেকে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়, যা স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার পর্যটকের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করে। যদিও সরকারিভাবে জানানো হয়েছে যে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছে এবং এই ঘটনায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর নেই। কিন্তু এই হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (United Arab Emirates)-এর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিস্তারিত বিবৃতিতে দেশবাসীকে জানানো হয়েছে, তাদের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী একাধিক প্রাণঘাতী মিসাইল ও ড্রোন সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শনিবার মোট ১৬টি ব্যালিস্টিক মিসাইল রাডারে শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১৫টিকে আকাশে থাকা অবস্থাতেই অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেমের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং বাকি একটি সাগরে পতিত হয়েছে। পাশাপাশি, রাডারে ধরা পড়া মোট ১২১টি ড্রোনের মধ্যে ১১৯টিকে সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে।
প্রশাসনের মিডিয়া বিভাগ সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বার্তায় নিশ্চিত করেছে যে, “সফলভাবে প্রতিহত করা একটি প্রজেক্টাইলের জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ মেরিনা এলাকার একটি আবাসিক টাওয়ারের বাইরের অংশে আছড়ে পড়ে। এর ফলে ভবনের বাইরের দিকে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হলেও পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো মানুষের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।” তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাতের আকাশে বিকট শব্দ এবং আলোর ঝলকানি সাধারণ মানুষের মনে গভীর ভীতির সঞ্চার করেছে।
এই চরম উত্তেজনাময় পরিস্থিতির মাঝেই দেশের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (Sheikh Mohammed bin Zayed Al Nahyan) আবু ধাবি (Abu Dhabi) টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে জাতির উদ্দেশ্যে এক বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য বার্তা। দেশবাসীকে সাহসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের দেশ এখন একটি কঠিন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা এই সংকটময় মুহূর্ত পার করে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠব।”
অন্যদিকে, এই চলমান সংঘাত ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার বিষয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে মুখ খুলেছেন বর্তমান ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian)। প্রতিবেশী দেশগুলোর আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং সেখানে হামলার জন্য তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক আবেগঘন ভাষণে তিনি বলেন, “যে সমস্ত প্রতিবেশী দেশে আঘাত হানা হয়েছে, তার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমার দেশের জনগণের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইছি।” তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান যে, অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন করে কোনো প্রতিবেশী দেশে আক্রমণ চালানো হবে না। তবে শর্ত একটাই, সেসব দেশের মাটি ব্যবহার করে তেহরান (Tehran)-এর ওপর যেন কোনো নতুন হামলা না হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) সম্প্রতি ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের যে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তার অত্যন্ত কড়া জবাব দিয়েছেন পেজেশকিয়ান। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, স্বাধীনচেতা ইরানি জনগণের আত্মসমর্পণের যে দিবা স্বপ্ন শত্রুরা দেখছে, তা তাদের কবরে নিয়ে যেতে হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই পুরো বিধ্বংসী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) ও ইসরায়েল (Israel) যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) নামে একটি ভয়াবহ সামরিক অভিযান চালায়। দীর্ঘদিন ধরে চলা পরমাণু আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে এই সমন্বিত ও অতর্কিত আক্রমণ চালানো হয়। সেই মর্মান্তিক হামলায় দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (Ayatollah Ali Khamenei) এবং তার স্ত্রী, কন্যা, জামাতা সহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হন। এই নজিরবিহীন ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গোটা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে এবং যুদ্ধের পরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ যদি দ্রুত থামানো না যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। উপসাগরীয় এই অঞ্চলটি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তাই এখানে অস্থিরতা মানেই পুরো বিশ্বের সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটা। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের এই অঞ্চল থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল দুবাইয়ের অর্থনীতিও এই ক্রমাগত সংঘাতের কারণে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে বেজে ওঠা সতর্কতামূলক সাইরেন এবং আকাশে মিসাইল ধ্বংসের বিকট শব্দ সাধারণ নাগরিকদের নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবে এই ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত হবে এবং কবে আবার এই অঞ্চলে শান্তির সুবাতাস বইবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

