নিজস্ব সংবাদদাতা:
“এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযােগ্য করে যাবাে আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
তাঁর ছাড়পত্র কবিতায় এমনটাই উল্লেখ করেছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। কোথাও যেন সেই প্রতিশ্রুতির আলোয় আলোকিত হয়েই আজ সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘আর্থ ডে’। কারণ এই প্রকৃতিই আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ, আমাদের জীবনের নীরব আশ্রয়, আমাদের সুস্থতার অদৃশ্য রক্ষাকবচ। সবুজ গাছের ডালে, নির্মল বাতাসের স্পর্শে, নদীর কলতানে লুকিয়ে আছে আমাদের আগামী দিনের স্বপ্ন। তাই পরিবেশকে রক্ষা করা মানে কেবল প্রকৃতিকে বাঁচানো নয়—এ আমাদের অস্তিত্বকে আগলে রাখা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখে হাসি ফোটানোর এক পবিত্র দায়বদ্ধতা। এই অনন্ত অঙ্গীকার বুকে নিয়েই মানুষ এগিয়ে চলেছে এক নির্মল, সবুজ ও সুন্দর ভবিষ্যতের পৃথিবী গড়ার স্বপ্নপথে
প্রতি বছর ২২ এপ্রিল এই দিনটি পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার বার্তা নিয়ে উদযাপন করা হয়। ১৯৭০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এই উদ্যোগ শুরু হলেও, বর্তমানে এটি ১৯০ টির বেশি দেশে পালিত একটি বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
এ বছরের ‘আর্থ ডে’-এর মূল বিষয় পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, পরিবেশপ্রেমী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ একযোগে নানা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। কোথাও বৃক্ষরোপণ অভিযান, কোথাও বা প্লাস্টিক বর্জনের প্রচার—সব মিলিয়ে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য।
রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও দিনটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়েছে। স্কুল ও কলেজে বিশেষ আলোচনা সভা, সচেতনতা র্যালি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান সংগঠিত হয়। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষকদের উদ্যোগ বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নদী ও জলাশয় পরিষ্কার করার কর্মসূচিতেও অংশ নেয়।
পরিবেশবিদদের মতে, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলির একটি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, হিমবাহ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি—এই সবই ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। পাশাপাশি বায়ুদূষণ, বনভূমি ধ্বংস এবং অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই যদি সচেতনতা না বাড়ে এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মকে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। তাই ‘Reduce, Reuse, Recycle’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই বিশেষ দিনে সাধারণ মানুষকেও পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, জল ও বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা, বেশি করে গাছ লাগানো এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার—এই ছোট ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান। তাই একদিনের সচেতনতা নয়, বরং প্রতিদিনের অভ্যাসেই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে—এই বার্তাই আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরল ‘আর্থ ডে’।

Recent Comments